বরিশালে মাদকবিরোধী তৎপরতায় বিতর্ক, দুই যুবককে মারধরের অভিযোগ বিএনপি নেতা ফারুকের বিরুদ্ধে

স্টাফ রিপোর্টার:

বরিশাল মহানগরীর টিবি হাসপাতাল এলাকার টিবি পুকুরপাড়ে মাদকবিরোধী তৎপরতার সময় দুই যুবককে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গত ২০ অক্টোবর রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক।

ঘটনাটি নিয়ে ফারুকের বক্তব্য নিয়েছে তালাশ বিডি। তিনি দুই যুবকের গায়ে হাত তোলার বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, কাজটি করা ঠিক হয়নি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট যুবকদের আচরণের কারণে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে তাঁর নিজের বক্তব্যেই প্রশ্ন উঠেছে—মাদকবিরোধী তৎপরতার নামে কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অধিকার কি কোনো রাজনৈতিক নেতা বা ব্যক্তির রয়েছে?

টিবি পুকুরপাড়ে দুই যুবককে মারধরের অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর রাতে টিবি হাসপাতাল এলাকার টিবি পুকুরপাড়ে মাদকবিরোধী তৎপরতার সময় ফারুকের সঙ্গে থাকা কয়েকজনের উপস্থিতিতে দুই যুবককে মারধর করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ফেসবুক লাইভের দৃশ্যেও দুই যুবকের গায়ে হাত তোলার ঘটনা দেখা গেছে বলে প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ।

তবে ভিডিওটির সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট, ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল এবং সংশ্লিষ্ট দুই যুবকের পরিচয় ও বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও প্রতিবেদনে যুক্ত করা জরুরি।

মাদকবিরোধী অভিযানের নামে আইন নিজের হাতে নেওয়ার প্রশ্ন

মাদক নির্মূলে সামাজিক সচেতনতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মাদক বিক্রি বা সেবনের অভিযোগ উঠলেই কাউকে মারধর করা কিংবা শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নেই। অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়াই আইনসম্মত পথ।

ফারুকের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে যুবকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তাঁদের আচরণ তাঁর কাছে অসম্মানজনক মনে হওয়ায় গায়ে হাত তোলেন। তাঁর এই ব্যাখ্যা মারধরের অভিযোগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরলেও শারীরিকভাবে আঘাত করার যৌক্তিকতা বা আইনগত বৈধতা নিজে থেকেই প্রতিষ্ঠা করে না।

এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, সংশ্লিষ্ট যুবকদের বক্তব্য এবং ভিডিওর পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

ফরিদ সিকদার ও তাজকে নিয়ে ভাইরাল ফটোকার্ড

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ফটোকার্ডে ফরিদ সিকদার ও তাজের সম্পর্ক নিয়ে দাবি করা হয়েছে। ফটোকার্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকবিরোধী তৎপরতার সময় ফারুকের সঙ্গে থাকা ফরিদ সিকদার আটক হওয়া এক যুবক তাজের বাবা।

তবে ফটোকার্ডে প্রচারিত এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফরিদ সিকদার ও তাজের পরিচয়, তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তাঁদের ভূমিকা নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। যাচাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

মাদকবিরোধী তৎপরতা নিয়ে ফারুকের রাজনৈতিক বক্তব্য

ফারুক দাবি করেছেন, এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগের কথা তিনি আগে থেকেই শুনেছিলেন। ঘটনার রাতে কয়েকজন যুবকের মাদক সেবনের খবর পেয়ে দলীয় কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুবকদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁদের আচরণ তাঁর কাছে অসম্মানজনক মনে হওয়ায় তিনি গায়ে হাত তোলেন।

তিনি আরও দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি বা তাঁর কর্মীরা চাঁদাবাজি কিংবা টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত নন। বরিশালে চাঁদাবাজ বা মাদক কারবারিদের আশ্রয় না দেওয়ার বিষয়ে দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে এসব রাজনৈতিক দাবি সংশ্লিষ্ট ঘটনার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের বিকল্প নয়।

মারধরের কথা স্বীকার করে ভুলের কথা বললেন ফারুক

তালাশ বিডির কাছে নিজের বক্তব্যে মনিরুজ্জামান খান ফারুক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পুরো ঘটনা উঠে আসেনি। এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ শুনে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, কয়েকজন যুবক মাদক সেবন করছিলেন—এমন তথ্য পেয়ে তিনি দলীয় কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাঁদের আচরণ তাঁর কাছে অসম্মানজনক মনে হওয়ায় তিনি মারধর করেন।

ফারুক বলেন, “আসলে অন্যায় হয়েছে, গায়ে হাত তোলা উচিত হয়নি। তাদের যে আচার-ব্যবহার, তার কারণে আমি কাজটা করে ফেলেছি। তবে উচিত ছিল তাৎক্ষণিক পুলিশকে খবর দিয়ে তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করা। পরবর্তীতে এরকম করার আগে অবশ্যই আরও সতর্ক হব।”

ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত ছিল কি না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল না; তিনি হঠাৎ সেখানে গিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী বরিশালে চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের আশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।

এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) বেলাল হোসাইন, পিপিএমের কাছে বক্তব্য জানতে চায় তালাশ বিডি। তাঁকে জানানো হয়, গত এক মাস ধরে বরিশাল মহানগর পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে সাংবাদিকেরাও পুলিশের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে অংশ নিয়েছেন। এসব অভিযানে অনেক মাদক কারবারিকে আটক করা হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাউকে মারধর করতে দেখা যায়নি।

এরপর গত ২০ অক্টোবর রাতে বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুকের বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী তৎপরতার সময় দুই যুবককে মারধরের অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর আইনগত ব্যাখ্যা ও পুলিশের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। তবে অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার বেলাল হোসাইন, পিপিএম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য বা বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *