ভিক্টোরিয়া কলেজ পাবে বাস, না হলে আবু তাহের ফাউন্ডেশন থেকে দেবেন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের

মোঃ আনজার শাহ:

একটি কলেজ, একটি প্রতিশ্রুতি আর একটি ফাউন্ডেশনের মানবিক অঙ্গীকার। শতবর্ষের গৌরব বুকে ধারণ করা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ দীর্ঘ দেড় দশকের অবহেলায় যখন তার হারানো ঐতিহ্যের জন্য অপেক্ষায়, ঠিক তখনই আশার আলো নিয়ে এলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী এবং কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমন। শুধু সরকারি উদ্যোগেই নয়, প্রয়োজনে নিজের বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত এ.কে.এম আবু তাহের ফাউন্ডেশন থেকে হলেও এই কলেজে বাস দেওয়ার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে ছাত্রাবাস নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নতুন ভবন নির্মাণে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন এই জনপ্রতিনিধি।

শুক্রবার সকাল ১১টায় কলেজের ডিগ্রি শাখার জিয়া মিলনায়তনে বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ এবং কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী হিসেবে এটি ছিল এই ঐতিহ্যবাহী কলেজে তাঁর প্রথম পদার্পণ।

স্মৃতি ও আবেগে মন্ত্রীর প্রথম পদার্পণ

কলেজ প্রাঙ্গণে পা রেখেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। বুকের গভীর থেকে উঠে আসা অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, “শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী এই কলেজের অনেক গল্প আমার মামার কাছ থেকে শুনেছি। তিনি নিজেও এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। সেই গল্পের কলেজে আজ নিজে এসে দাঁড়াতে পেরে সত্যিই গর্বিত বোধ করছি।”

তবে স্মৃতিমাখা সেই আবেগ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কলেজের জিয়া মিলনায়তনের জীর্ণ অবস্থা দেখে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “গত ১৫ বছরে এই কলেজে কী কী উন্নয়ন হয়েছে?” এরপর স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, বিগত ১৭ বছরে এই গৌরবময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নয়নের সামান্যতম ছোঁয়াও লাগেনি।

ফাউন্ডেশন থেকেও বাস, প্রতিশ্রুতি থেকে সরবেন না মন্ত্রী

মন্ত্রী দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা দেন, চলতি বছরই কলেজকে দুটি বাস দেওয়া হবে। তিনি বলেন, “এ বছর এই কলেজে দুটি বাস দেব। যদি কোনো কারণে সরকারিভাবে তা সম্ভব না হয়, তাহলে আমার বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত এ.কে.এম আবু তাহের ফাউন্ডেশন থেকে হলেও সেই বাস দেব। এই প্রতিশ্রুতি থেকে আমি কখনো সরে আসব না।”

মন্ত্রী আরও বলেন, “মানুষের কল্যাণে কাজ করাই এ.কে.এম আবু তাহের ফাউন্ডেশনের মূল লক্ষ্য। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই ফাউন্ডেশনের মানবিক অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী হবে। আমার স্বপ্ন, এই ফাউন্ডেশনের কল্যাণমুখী কার্যক্রম একদিন সারাদেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।”

শুধু ভিক্টোরিয়া কলেজের জন্যই নয়, সারাদেশের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সংকট নিরসনেও সরকার সচেষ্ট বলে জানান মন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী বাজেটে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ১৭ আসনের ঊর্ধ্বের বাস শুল্কমুক্ত করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের যাতায়াত দুর্ভোগ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।

ফাউন্ডেশনের প্রশংসায় বরুড়া বিএনপি সভাপতি

বরুড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি কায়সার আলম সেলিম বলেন, “এ.কে.এম আবু তাহের ফাউন্ডেশন মানুষের কল্যাণে যে নিঃস্বার্থ ভূমিকা রেখে চলেছে, তা সত্যিই অনুকরণীয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নিজের ফাউন্ডেশন থেকে বাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করে, এই প্রতিষ্ঠান শুধু নামেই নয়, কাজেও মানুষের পাশে আছে। এই মানবিক ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের প্রতিটি প্রান্তের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছেও এর আলো পৌঁছে যাবে।”

স্থানীয় বাসিন্দা ও গৃহায়ন মন্ত্রীর একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেন কল্লোলের প্রতিক্রিয়া

স্থানীয় বাসিন্দা মোয়াজ্জেম হোসেন কল্লোল বলেন, “এ.কে.এম আবু তাহের ফাউন্ডেশন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, এটি একটি মানবিক আন্দোলনের নাম। এই ফাউন্ডেশন যেভাবে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য বাস দেওয়ার মতো উদ্যোগ নিচ্ছে, তা সত্যিই বিরল। একজন মন্ত্রী তাঁর নিজের অর্থে মানুষের জন্য কিছু করতে চাইছেন, এটি দেখে আমরা অনুপ্রাণিত। এই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হোক এবং সারাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছে যাক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

মিলনায়তন সংস্কারে ৭০ লাখ টাকার আশ্বাস

দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ মিলনায়তন সংস্কারেও আশার বাণী শোনা গেছে অনুষ্ঠানে। স্থানীয় সংসদ সদস্য মিলনায়তন সংস্কারে ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর বাইরে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের ঘোষণাও এসেছে। মন্ত্রী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, “একে একে এই কলেজে সব উন্নয়ন হবে, এটাই আমার লক্ষ্য এবং প্রতিজ্ঞা।”

বিএনপির উন্নয়নধারার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন মন্ত্রী

ইতিহাসের পাতা উল্টে অতীতের উন্নয়নচিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “বিএনপি সরকার যতবার ক্ষমতায় এসেছে, ততবারই সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করেছে। বেগম খালেদা জিয়া স্বয়ং এই কলেজকে বাস উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর আর কেউ এই কলেজের কথা ভাবেনি।” তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের অবহেলার কালো অধ্যায়ের ইতি ঘটিয়ে এই কলেজকে তার প্রাপ্য মর্যাদায় ফিরিয়ে আনাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান

কলেজের ভৌত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “শুধু চার দেয়াল আর ইট-সিমেন্টের অবকাঠামো দিয়ে একটি জাতি এগিয়ে যায় না। শিক্ষার প্রকৃত মান নিশ্চিত করতে হবে এবং এই মহান দায়িত্ব শিক্ষকদেরই কাঁধে তুলে নিতে হবে। মানসম্পন্ন শিক্ষাই পারে একটি জাতিকে সত্যিকার অর্থে আলোকিত করতে।” তিনি আরও বলেন, শতবর্ষের এই কলেজের গৌরবময় ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে শিক্ষার গুণগত মানের কোনো বিকল্প নেই।

শিক্ষকদের দাবি ও মন্ত্রীর আশ্বাস

অনুষ্ঠানে কলেজের শিক্ষকেরা মন্ত্রীর কাছে একগুচ্ছ দাবি তুলে ধরেন। নতুন ভবন ও ছাত্রাবাস নির্মাণ, নতুন শিক্ষক পদ সৃষ্টি এবং দীর্ঘদিন ধরে বেদখলে থাকা কলেজের মূল্যবান জমি পুনরুদ্ধার ছিল তাঁদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম। মন্ত্রী এসব দাবি মনোযোগ দিয়ে শুনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

৩০০ কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা, ১০৮ জন পুরস্কৃত

কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবুল বাসার ভূঁঞার সভাপতিত্বে আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ২০২৫ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অন্তত ৩০০ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা জানানো হয়। একই সঙ্গে বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় উচ্চমাধ্যমিক শাখার ৫০ জন এবং ডিগ্রি শাখার ৫৮ জনসহ মোট ১০৮ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক মো. শাহ আলম, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আমিরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম, কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উদ্বাতুল বারী আবু এবং কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবদুল মজিদ। স্বাগত বক্তব্য দেন বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা কমিটির আহ্বায়ক এবং অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আমেনা বেগম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল কুদ্দুস।

এক নজরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ

কুমিল্লা নগরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ের রানীর দিঘিরপাড়ে উচ্চমাধ্যমিক শাখা এবং সেখান থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে আদর্শ সদর উপজেলার ধর্মপুর এলাকায় ডিগ্রি শাখা অবস্থিত। ৩২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে বর্তমানে ২৯ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। ১৭৫ জন শিক্ষক এবং ১৬৫ জন কর্মচারীর সমন্বয়ে পরিচালিত এই বিদ্যাপীঠে ২০টি বিষয়ে অনার্স এবং ১৮টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *