মজুরি-নিরাপত্তাসহ ১০ দফা দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকার, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ১০ দফা দাবি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ’

রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেল ৩টায় রিপোর্টার্স ইউনিয়নের শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১০টি গার্মেন্টস ফেডারেশনের ঐকমত্যের ভিত্তিতে গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ গঠন করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্টস দর্জি শ্রমিক কেন্দ্র, সবুজ-বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় গার্মেন্টস-সোয়েটার শ্রমিক ফেডারেশন, মাদারল্যান্ড গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ লেবার কংগ্রেস, বাংলাদেশ গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন, গণতান্ত্রিক গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ঐক্য পরিষদ যুক্ত রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মঞ্চের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক কর্মরত, যাদের বড় একটি অংশ নারী। অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও শ্রমিকরা বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট, চাকরির অনিশ্চয়তা, ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ, বেতন-বোনাস পরিশোধে অনিয়ম, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

সংগঠনটির দাবি, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই বা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে শতাধিক কারখানা বন্ধ ও গণছাঁটাইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।

শ্রমিকদের ন্যায্য ও জীবনযাপনযোগ্য মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা, সময়মতো বেতন-বোনাস, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান নেতারা।

১০ দফা দাবি

১. জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন।

২. বন্ধ শিল্প-কারখানা দ্রুত চালু এবং অন্যায় ও বেআইনি শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ।

৩. শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তির মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও অধিকার হরণ বন্ধ।

৪. শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

৫. প্রয়োজনীয় শ্রম বিধিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর এবং শ্রম আইন যথাযথ বাস্তবায়ন।

৬. গার্মেন্টস শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।

৭. মাতৃত্বকালীন ছুটি ন্যূনতম ছয় মাস করা এবং নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৮. শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের পাশাপাশি সাশ্রয়ী আবাসন, চিকিৎসা, পরিবহন, রেশনিং ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৯. শ্রমিকদের অবাধে সংগঠিত হওয়া, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করা এবং এ কারণে হয়রানি বা চাকরিচ্যুতি বন্ধ করা।

১০. জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিবছর গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা।

অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব খাতে ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের বেতন সে অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে বর্তমান মজুরিতে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, অপর্যাপ্ত আয়ের কারণে অনেক শ্রমিক ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক ব্যয় কমিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিল্পাঞ্চলগুলোতে বাড়তি বাসাভাড়াও শ্রমিক পরিবারের ওপর চাপ তৈরি করছে।

আতিকুর রহমান বলেন, ‘মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার।’ শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে জীবনধারণ উপযোগী মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ১৩৯(৬) অনুযায়ী নির্ধারিত নিম্নতম মজুরি প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণের বিধান রয়েছে। ২০২৩ সালে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের জন্য ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান বাস্তবতায় মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা প্রয়োজন।

১০ দফা দাবি আদায়ে ঢাকা, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *