মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
যুক্তিনির্ভর চিন্তাচর্চা, বিশ্লেষণী দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সচেতন নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে “নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা বিতর্ক উৎসব ২০২৬”। সোমবার (১৫ জুন ২০২৬) সকাল ১০টায় নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা ওঠে আট দিনব্যাপী এ উৎসবের।
“যুক্তির সমীরণে প্রাচ্যের ডান্ডি” প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই বিতর্ক উৎসব Climate Resilient Campus Initiative-এর আওতায় নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং লজিক অব বাংলাদেশের সার্বিক সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের যুক্তিবোধ, নেতৃত্বগুণ, বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হান কবির। পুরো আয়োজনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদিয়া আক্তার, ফতুল্লার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামানসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তা, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। তিনি বলেন, বিতর্কচর্চা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ করে এবং বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার মানসিকতা তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মকে সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিতর্কের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন এবং জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, শিল্প ও বাণিজ্যের ঐতিহ্যের পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মেধাচর্চার ক্ষেত্রেও নারায়ণগঞ্জের একটি গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। “প্রাচ্যের ডান্ডি” হিসেবে পরিচিত এই জেলার সেই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করতে বিতর্কচর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি শিক্ষার্থীদের মুক্তবুদ্ধি, সহনশীলতা এবং যুক্তিনিষ্ঠ মনোভাব গড়ে তুলতে নিয়মিত বিতর্কচর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে অনুষ্ঠিত হয় একটি বিশেষ বিতর্ক কর্মশালা। এতে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ৬৪টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী এবং ৬০ জন শিক্ষক অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালায় বিতর্কের মৌলিক কৌশল, তথ্যনির্ভর উপস্থাপনা, যৌক্তিক বিশ্লেষণ, বক্তব্য প্রদানের দক্ষতা এবং সমসাময়িক জাতীয় ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
আয়োজক সূত্রে জানা যায়, আট দিনব্যাপী এ উৎসবে প্রাথমিক পর্যায় থেকে ৩২টি এবং মাধ্যমিক পর্যায় থেকে ২৮টি দল অংশগ্রহণ করবে। নকআউট পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতা শেষে শ্রেষ্ঠ দুটি দল গ্র্যান্ড ফাইনালে মুখোমুখি হবে। চূড়ান্ত পর্ব জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে বিজয়ীদের সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করা হবে।
আয়োজকদের মতে, এই বিতর্ক উৎসব শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিবাদী চিন্তাচর্চা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নেতৃত্বগুণ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ বিকাশের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেও এ আয়োজন ভূমিকা রাখবে।
প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে খ্যাত নারায়ণগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। আয়োজকদের বিশ্বাস, “নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা বিতর্ক উৎসব ২০২৬” নতুন প্রজন্মের প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি জাতীয় বিতর্ক অঙ্গনে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যকে আরও সুদৃঢ় ও সমৃদ্ধ করবে।