লামায় স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতিতে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা ডায়াবেটিস ইউনিটের দাবি

মোঃ রাসেল:

বান্দরবানের লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রশাসনিক দাবি ও নিয়োগবিধি সংশোধনের দাবিতে বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের লামা উপজেলা শাখার মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছেন। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ব্যানার নিয়ে তাঁদের অবস্থানের কারণে উপজেলার প্রত্যন্ত ও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে, স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতির মধ্যেই লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৃথক ডায়াবেটিস চিকিৎসা ইউনিট, ডে-কেয়ার সেন্টার ও আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বান্দরবানের এই জনপদে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালে বিশেষায়িত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবার ও চিকিৎসাসেবাসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লামা এলাকায় ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিক ও ফার্মেসিতে রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ও বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর প্রবণতা বেড়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।

সচেতন মহলের উদ্বেগের বিষয় হলো, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের একটি বড় অংশ দিনমজুর, প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্য। দীর্ঘমেয়াদি এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, ইনসুলিন ও ওষুধ গ্রহণ প্রয়োজন। এসব চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে অনেক রোগী মাঝপথে চিকিৎসা ও ওষুধ গ্রহণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাসময়ে চিকিৎসা না হলে কিডনি বিকল হওয়া, দৃষ্টিশক্তি হারানো, হৃদ্‌রোগ এবং স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতাসহ নানা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রোগীদের জন্য সহজলভ্য ও নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

এ পরিস্থিতিতে লামার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং বান্দরবান জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে সাত দফা দাবি জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দ্রুত পৃথক ডায়াবেটিস চিকিৎসা ইউনিট ও ডে-কেয়ার সেন্টার চালু, জরুরি রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট শয্যা বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ পরীক্ষাগার স্থাপন।

প্রস্তাবিত পরীক্ষাগারে রক্তে গ্লুকোজ, HbA1c, কিডনি ফাংশন পরীক্ষা—বিশেষ করে ক্রিয়েটিনিন—এবং লিপিড প্রোফাইলসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে অসচ্ছল রোগীদের বিনামূল্যে অথবা বিশেষ ভর্তুকিমূল্যে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ এবং প্রত্যন্ত ইউনিয়ন ও পাহাড়ি গ্রামগুলোতে নিয়মিত বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ ক্যাম্প চালুর আহ্বান জানানো হয়েছে।

স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সচেতন মহলের মতে, একদিকে জনবল ও প্রশাসনিক দাবিতে স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি, অন্যদিকে বিশেষায়িত চিকিৎসা ও আধুনিক রোগ নির্ণয়ের সুবিধার অভাব—সব মিলিয়ে লামার দরিদ্র ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ চিকিৎসাসেবা পেতে নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁদের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি আরও বেশি।

স্থানীয়দের মতে, স্বাস্থ্য সহকারীদের দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন, যাতে মাঠপর্যায়ের টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকে। একই সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডায়াবেটিস ইউনিট ও আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত অসচ্ছল মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং নিয়মিত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

জনস্বার্থ বিবেচনায় লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক করা, স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি নিরসন এবং পৃথক ডায়াবেটিস ইউনিট ও আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপনে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *