স্টাফ রিপোর্টার:
অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জের কার্যক্রম। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আবাসনের কারণে এমনিতেই উখিয়ার পাহাড় ও বনাঞ্চল চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বন ও পাহাড়ের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে যেখানে বন পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা, সেখানে উল্টো বনভূমি দখল, পাহাড় কাটা, মাটি পাচার, বনজ সম্পদ পাচার ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, উখিয়া রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে সদ্য বদলি হওয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহীনুল ইসলামের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটা, বনভূমি দখলে সহযোগিতা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে সুযোগ করে দেওয়া, বনজ সম্পদ পাচার এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাঝেমধ্যে দুয়েকটি অভিযান পরিচালনা করা হলেও এর আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলেছে কথিত অবৈধ বাণিজ্য। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সূত্রের দাবি, চাকরিজীবনের প্রথম পোস্টিং হিসেবে উখিয়া রেঞ্জে দায়িত্ব পাওয়ার পরই শাহীনুল ইসলাম বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। বহুমুখী দুর্নীতির এসব অভিযোগ বন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হলেও তার কর্মকালীন সময়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নীরবতা ও প্রশ্রয়ের কারণে এসব কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
অভিযোগের তীর উঠেছে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ডিএফও আব্দুল্লাহ আল মামুনের দিকেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, উখিয়া রেঞ্জে শাহীনুল ইসলামের দায়িত্ব পালনকালে পাহাড় কাটা, বনভূমি দখল এবং বনজ সম্পদ পাচারের মতো কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দায়িত্বশীল পর্যায়ে অবগত থাকা সত্ত্বেও দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ প্রকাশিত হলেও সেসব বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ডিএফও আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রায় নয় মাস আগে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে যোগ দেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় উখিয়া রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে পাহাড় কাটা ও মাটি পাচারের মতো কর্মকাণ্ড চলেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উখিয়ায় বনভূমি রক্ষা করতে গিয়ে তৎকালীন ফরেস্টার সাজ্জাদুজ্জামান নিহত হওয়ার ঘটনার পরও বন ও পাহাড় নিধনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দাবি, এসব প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে। সদ্য বদলি হওয়া শাহীনুল ইসলামের বিরুদ্ধেও এসব চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শাহীনুল ইসলামের বদলির পরও উখিয়ার বনাঞ্চলে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। বরং বন ও পাহাড় রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বনখেকোদের সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে উখিয়ার বিভিন্ন বনাঞ্চলে গেলে বনভূমির ভেতরে ঘরবাড়ি, দোকানপাটসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণের চিত্র দেখা যায় বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সবুরের অভিযোগ, বনভূমি জবরদখল প্রতিরোধের পরিবর্তে উখিয়ার তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তার নেতৃত্বে বন বিভাগের একটি চক্র বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ করে দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তার দাবি, এসব স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেলেও বনের জমিতে নির্মিত পুরোনো স্থাপনা থেকে মাসোহারা আদায়ের সঙ্গে শাহীনুল ইসলামের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন এনজিওর কার্যক্রমে বন বিভাগের কাঠ ও বাঁশ সরবরাহের ক্ষেত্রেও অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেন হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গাছ পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বন আইনের আওতায় আনার পরিবর্তে তাদের সুযোগ করে দেওয়া এবং নিরাপত্তা দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, টেকনাফ ও উখিয়ায় অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বাঁশের প্রয়োজন হয়। এই বিশাল চাহিদাকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বন বিভাগের কাঠ ও বাঁশ সরবরাহের ক্ষেত্রে নিয়মনীতির ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের দায়িত্বশীল পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।
এ ছাড়া এই সিন্ডিকেটের বাইরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বনাঞ্চল থেকে কাঠ ও বাঁশ পাচারের আরও একাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব চক্রের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে বনজ সম্পদ পাচারের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে সদ্য বিদায়ী উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
বন বিভাগের সূত্রে জানা যায়, শাহীনুল ইসলাম কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। বন বিভাগের বিধি অনুযায়ী রেঞ্জ ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে তিনি এক বছরের জন্য উখিয়া রেঞ্জের দায়িত্ব পান। অভিযোগ রয়েছে, এই এক বছরের দায়িত্বকে কেন্দ্র করে তিনি বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন এবং বনভূমি দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা করেন।
স্থানীয় পর্যায়ে শাহীনুল ইসলামকে ঘিরে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ঘনিষ্ঠজনদের কাছে এমন মনোভাব প্রকাশ করতেন যে ভবিষ্যতে আর উখিয়া রেঞ্জে দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে এসব কথোপকথনের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে শাহীনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হয়। তাকে খুদেবার্তাও পাঠানো হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ডিএফও আব্দুল্লাহ আল মামুনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাকে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
ফলে উখিয়া রেঞ্জে বনভূমি দখল, পাহাড় কাটা, মাটি পাচার, বনজ সম্পদ পাচার এবং কথিত মাসোহারা আদায়ের এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত এবং বনাঞ্চল রক্ষায় দায়িত্বশীলদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।