শুধু স্বামী-স্ত্রী পরিচয়েই কি বিয়ে হয়? ইসলামের বিধান কী

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক:

মানুষের জীবনে পবিত্রতা, মানসিক প্রশান্তি ও পারিবারিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক চাহিদাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি বিবাহের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম, শর্ত ও শিষ্টাচার নির্ধারণ করেছে। তাই শুধু একজন নারী ও পুরুষ পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলেই ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায় না।

ইজাব-কবুল ও সাক্ষী

ইসলামি শরিয়তে বিয়ের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ইজাব ও কবুল—অর্থাৎ প্রস্তাব ও গ্রহণ। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, বিয়ের সময় সাক্ষীর উপস্থিতিও আবশ্যক। সাধারণভাবে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল সম্পন্ন করা হয়।

বিখ্যাত ফকিহ আলাউদ্দিন কাজানি (রহ.) বলেছেন, ‘বিয়ের মূল ভিত্তি হলো ইজাব ও কবুল।’

ইবনু নুজাইম (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু মুখে মুখে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমে নতুন কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারণ, কোনো সম্পর্কের স্বীকারোক্তি দেওয়া এবং শরিয়তসম্মতভাবে নতুন বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।

অর্থাৎ নারী ও পুরুষ পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রী বলে দাবি করলেও প্রয়োজনীয় ইজাব-কবুল ও অন্যান্য শরিয়তসম্মত শর্ত পূরণ না হলে শুধু সেই দাবির ভিত্তিতে বৈধ বিবাহ প্রতিষ্ঠিত হয় না।

বিয়ের গুরুত্ব

ইসলাম যুবসমাজকে পাপ ও অনৈতিকতা থেকে দূরে রাখতে এবং চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষায় বিয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

‘হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে নেয়, কেননা তা চক্ষুকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান রক্ষা করে।’

(বুখারি, ৫০৬৬)

বিয়ের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন—

‘যখন বান্দা বিয়ে করে, তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূরণ করে। অতএব, বাকি অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’

(বায়হাকি, ৫৪৮৬; তাবরানি, ৯৭২)

অভিভাবক ও বিয়ের ঘোষণা

বিয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা নিয়েও হাদিসে নির্দেশনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

‘অভিভাবক ছাড়া বিয়ে সংঘটিত হয় না।’

(তিরমিজি, ১১০১)

এ ছাড়া বিয়ে প্রকাশ্যভাবে সম্পন্ন করার ওপরও ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবার ও সমাজকে জানিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করলে বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের জটিলতা ও বিভ্রান্তির সুযোগ কমে।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে সতর্কতা

ইসলামে বৈধ বিবাহের বাইরে নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক ও অনৈতিক মেলামেশা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘তোমরা জিনার কাছেও যেও না। নিশ্চয় তা অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’

(সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩২)

অবৈধ সম্পর্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে—এমন বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকেও সতর্ক করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

‘দুই চোখের জিনা হলো (কামনার সঙ্গে) তাকানো, দুই কানের জিনা হলো (অবৈধ কথা) শোনা, জিহ্বার জিনা হলো কথা বলা, হাতের জিনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের জিনা হলো সেদিকে হেঁটে যাওয়া। আর অন্তর কামনা করে ও আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, আর লজ্জাস্থান সেটিকে বাস্তবায়িত করে অথবা করে না।’

(বুখারি, ৬২৪৩)

গায়রে মাহরামের সঙ্গে নির্জনে থাকা

গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জনে অবস্থান সম্পর্কেও রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন—

‘কোনো পুরুষ যখন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে একত্রিত হয়, তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’

(তিরমিজি, ২১৬৫)

ইসলামে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র বৈবাহিক চুক্তি। তাই শুধু পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া বা নিজেদের মধ্যে এমন দাবি করার মাধ্যমে বৈধ বিবাহ প্রতিষ্ঠিত হয় না। শরিয়তসম্মত ইজাব-কবুল, সাক্ষী এবং প্রযোজ্য অন্যান্য শর্ত পূরণের মাধ্যমেই বিবাহ সম্পন্ন করতে হয়।

একই সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, অবৈধ দৃষ্টিপাত ও অনৈতিক মেলামেশা থেকে দূরে থেকে নিজের চরিত্র ও পবিত্রতা রক্ষার ওপরও ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *