মো. সাইদুল ইসলাম:
ঢাকার আশুলিয়ার ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মো. মাসুদ করিমের বিরুদ্ধে সাবেক প্রশাসক মো. মহাইমিনুল ইসলামের স্বাক্ষর নকল করে পেছনের তারিখে একাধিক ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু এবং লাইসেন্স প্রদানের নামে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দা ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাংবাদিকরা ইউনিয়ন পরিষদে গেলে সচিবের কাছ থেকে সন্তোষজনক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক প্রশাসকের দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তাঁর স্বাক্ষর ব্যবহার করে ট্রেড লাইসেন্স তৈরির ঘটনা ঘটেছে। এসব লাইসেন্স কীভাবে প্রস্তুত ও ইস্যু করা হয়েছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এর বিপরীতে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে সন্তোষজনক উত্তর না দেওয়ার অভিযোগ
ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বক্তব্য জানতে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদে যান। সেখানে তাঁরা সচিব মো. মাসুদ করিমের কাছে সাবেক প্রশাসকের স্বাক্ষর নকল করে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের বিষয়ে জানতে চান।
সাংবাদিকদের দাবি, অভিযোগের বিষয়ে একের পর এক প্রশ্ন করা হলেও সচিব সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। বরং তিনি বিভিন্ন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন বলেও অভিযোগ করেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। তবে এ বিষয়ে সচিবের নিজস্ব বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংবাদে যুক্ত করার সুযোগ থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম, অনুমোদন ও সরকারি নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে নথি তৈরি বা অনুমোদনহীনভাবে লাইসেন্স ইস্যুর অভিযোগ উঠলে তা প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ, এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে সরকারি নথির নির্ভরযোগ্যতা, রাজস্ব আদায় এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের স্বার্থ জড়িত।
ট্রেড লাইসেন্স ও জন্মনিবন্ধন সেবা নিয়েও অভিযোগ
এদিকে, ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদে ট্রেড লাইসেন্স ও জন্মনিবন্ধন সেবাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগসংশ্লিষ্ট একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে। ওই ভিডিওতে কী ঘটেছিল, কারা জড়িত ছিলেন এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে কিছু সেবাগ্রহীতাকে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপের মুখে পড়তে হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল পাওয়া না যাওয়ায় অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সেবাগ্রহীতাদের স্বার্থ রক্ষায় ট্রেড লাইসেন্স ও জন্মনিবন্ধনসহ ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন সেবার নির্ধারিত ফি, আবেদনপ্রক্রিয়া এবং অর্থ গ্রহণের নিয়ম স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। একই সঙ্গে প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের বিপরীতে যথাযথ রসিদ প্রদান এবং সরকারি নথিপত্র সংরক্ষণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
স্বাক্ষর জালের অভিযোগ তদন্তের দাবি
সাবেক প্রশাসকের স্বাক্ষর নকল করে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের মূল নথি, ইস্যুর তারিখ, স্বাক্ষর, অনুমোদনসংক্রান্ত রেকর্ড এবং সরকারি ফি জমার হিসাব পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং নথির সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করে আনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে একদিকে যেমন প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে, অন্যদিকে নির্দোষ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তদন্তে কোনো অনিয়ম, জালিয়াতি কিংবা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ হয়রানি ছাড়াই নির্ধারিত নিয়মে সরকারি সেবা পেতে পারেন।
অভিযোগের বিষয়ে ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. মাসুদ করিম এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে।