মোহাম্মদ রুমী শরীফ:
ভালো ফলনের আশায় বীজ কিনেছিলেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার কৃষকরা। বস্তায় ছিল সরকারি প্রত্যয়নসংক্রান্ত হলুদ ট্যাগ, কোম্পানির ব্র্যান্ড ও উচ্চফলনশীল ধানের পরিচয়। নির্ধারিত নিয়ম মেনে বীজ তৈরি করে আমন মৌসুমে জমিতে রোপণও করেছিলেন তারা। কিন্তু ধান কাটার স্বাভাবিক সময় আসার অনেক আগেই জমির একেকটি গোছায় প্রায় অর্ধেক চারায় বেরিয়ে এসেছে ধানের শীষ। কাঁচা ধান আগাম বের হওয়ায় স্বাভাবিক সময়ে এগুলো টিকবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, ইউনাইটেড সীড ব্র্যান্ডের ব্রি-৪৯ ধানের বীজ ব্যবহার করেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কলাপাড়া উপজেলার আলিপুর ও মহিপুর এলাকায় অর্ধশতাধিক কৃষকের জমিতে একই ধরনের আগাম শীষ বের হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, একই গোছায় ধানের পরিপক্বতার সময় এক না হওয়ায় আগাম বের হওয়া ধান স্বাভাবিক কাটার সময়ের আগেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ পাকা ধান পাওয়া নাও যেতে পারে। ফলে জমি প্রস্তুত, সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচসহ তাদের পুরো বিনিয়োগ লোকসানে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আলিপুর ও মহিপুর বাজারের বিভিন্ন বীজ ডিলার ও বিক্রেতার কাছ থেকে তারা ইউনাইটেড সীডের প্যাকেটজাত বীজ কিনেছেন। বস্তার গায়ে উল্লেখ করা খুচরা মূল্য পরিশোধ করে বীজ সংগ্রহের পর নিজেরাই ওই বীজ থেকে বীজ তৈরি করে জমিতে রোপণ করেন।
কৃষকদের ভাষ্য, বীজ তৈরি ও চারা রোপণের সময় কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি। তবে রোপণের প্রায় ১৫ দিনের মধ্যেই ধানের চারায় আগাম শীষ বের হতে শুরু করে। প্রথমে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও পরবর্তী সময়ে একই এলাকার একাধিক কৃষকের জমিতে একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। এরপর কৃষকেরা বীজ বিক্রেতা, ডিলার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
কৃষকদের দাবি, অভিযোগের পর স্থানীয় ডিলার ও বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ কীভাবে নির্ধারণ হবে, কে ক্ষতিপূরণ দেবে এবং কখন দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত নিশ্চয়তা নেই। এতে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে থাকা বস্তায় ইউনাইটেড সীড ব্র্যান্ডের ব্রি-৪৯ জাতের ধানের তথ্য রয়েছে। ১০ কেজির বস্তায় অঙ্কুরোদ্গমের হার ৮০ শতাংশ, বিশুদ্ধতার হার ৯৮ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ২০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। মেয়াদের শেষ তারিখ চলতি বোরো/আমন মৌসুম পর্যন্ত উল্লেখ থাকলেও উৎপাদনের তারিখ নেই বলে কৃষকদের অভিযোগ।
কৃষকেরা বলেন, বস্তার গায়ে উচ্চফলনশীল উল্লেখ এবং হলুদ ট্যাগ দেখে তারা বীজের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, প্রত্যয়ন করা বীজ কিনে চাষ করলে বীজের উৎস ও বাজারজাত ব্যবস্থায় সরকারি নজরদারি রয়েছে। কিন্তু জমিতে আগাম শীষ বের হওয়ায় সেই আস্থাই এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তাদের প্রশ্ন, সরকারি প্রত্যয়নসংক্রান্ত হলুদ ট্যাগ নিয়ে বাজারে আসা বীজ কীভাবে একাধিক ডিলার ও বিক্রেতার মাধ্যমে কৃষকের জমিতে পৌঁছাল এবং পুরো বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায় তদারকি কতটা ছিল।
পটুয়াখালী জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত বীজ ডিলারের সংখ্যা ১২৪টি। এর মধ্যে কলাপাড়া উপজেলায় ১২ জন এবং আলিপুর-মহিপুর এলাকায় তিনজন ডিলার রয়েছেন।
আলিপুর বাজারের হাওলাদার কৃষি ঘরের স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল নিজেকে ইউনাইটেড সীডের নিবন্ধিত পরিবেশক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তার দাবি, তার কোডের মাধ্যমে স্থানীয় অন্তত ২০ জন বিক্রেতা বীজ নিয়েছেন। আবু ডিলার, চানমিয়া ব্যাপারী ও আলী বীজ ঘরসহ বেশ কয়েকজন বিক্রেতা তার কাছ থেকে বীজ নিয়েছেন।
সোহেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি সরাসরি কোম্পানির কাছ থেকে প্যাকেটজাত বীজ এনে বিভিন্ন ডিলার ও কৃষকের কাছে বিক্রি করেন। চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় ১ হাজার ২০০ বস্তা ইউনাইটেড সীড বিক্রি করেছেন।
একজন পরিবেশকের কোড ব্যবহার করে যদি অন্তত ২০ জন বিক্রেতা বীজ সংগ্রহ করে থাকেন এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ বস্তা বাজারজাত হয়ে থাকে, তাহলে ওই বীজ কোন কোন বাজারে গেছে, কত কৃষক তা ব্যবহার করেছেন এবং অভিযোগ ওঠার পর একই চালানের অবিক্রীত বীজ কোথায় রয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বীজের প্রতিটি চালানের ক্রয়-বিক্রয় হিসাব, ডিলারভিত্তিক সরবরাহ, বস্তার ব্যাচ বা চালান নম্বর এবং বিক্রেতাদের বিক্রির রেকর্ড যাচাই করা হলে কৃষকের জমিতে পৌঁছানো বীজের সরবরাহপথ স্পষ্ট হতে পারে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, আলিপুর ও মহিপুর এলাকার আলী বীজ ঘর, আকন বীজ ঘর, হাওলাদার কৃষি ঘরসহ প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠানে একই ব্র্যান্ডের বীজ পাওয়া গেছে। কৃষকদের দাবি, এসব বস্তার লেখা, নকশা ও রং একই ধরনের।
লতাচাপলি ইউনিয়নের খাজুরা এলাকার কৃষক কালু মুসল্লী প্রায় দুই একর জমিতে ইউনাইটেড সীডের ব্রি-৪৯ ধান চাষ করেছেন। তিনি স্থানীয় বাজারের হাজী মোহাম্মদ চান মিয়ার কাছ থেকে বীজ কিনেছিলেন। পরে সেই বীজ দিয়ে নিজেই বীজ তৈরি করে জমিতে রোপণ করেন।
কালু মুসল্লী বলেন, তার জমিতে আগেভাগেই প্রায় চার আনা পরিমাণ ধানে শীষ বের হয়ে গেছে। ভালো ফলনের আশায় সরকারি ধানের পরিবর্তে কোম্পানির বীজ কিনেছিলেন। কিন্তু এখন ফলনের আগেই ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তিনি।
কৃষক মো. মেহেদী খান এক কানি ছয় কড়া জমিতে একই বীজ ব্যবহার করেছেন। তার ভাষ্য, জমির অনেক ধানের গোছায় নির্ধারিত সময়ের আগেই কাঁচা ধান বের হয়ে গেছে। সার, ওষুধ ও চাষাবাদের খরচ বহন করার পর এমন পরিস্থিতিতে পড়ায় পুরো বিনিয়োগ লোকসানে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
আলিপুরের হাওলাদার কৃষি ঘরের স্বত্বাধিকারী সোহেল বলেন, অভিযোগ পাওয়া কৃষকদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছেন। শেষ পর্যন্ত যার যতটুকু ক্ষতি হবে, তা নির্ধারণ করে কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন বলেন, বাজারজাত করা একটি ব্র্যান্ডের ধানের বীজ ব্যবহার করে কিছু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। কৃষকদের কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন।
জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান বলেন, হলুদ ট্যাগ লাগানো ইউনাইটেড সীডের প্রত্যয়ন সরাসরি মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়েছে। কোনো বীজের মান খারাপ হয়ে থাকলে কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট ডিলার দায়ী থাকবেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে বীজ প্রত্যয়ন বিভাগ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সহযোগিতার চেষ্টা করবে।
তবে কৃষকদের প্রশ্ন শুধু ক্ষতিপূরণ নিয়ে নয়। হলুদ ট্যাগ নিয়ে বাজারে আসা বীজ কীভাবে একাধিক ডিলার ও বিক্রেতার হাত ঘুরে কৃষকের জমিতে পৌঁছাল, সরবরাহের প্রতিটি ধাপের হিসাব কোথায়, অভিযোগ পাওয়ার পর অবশিষ্ট বীজের কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কৃষকের জমিতে আগাম শীষ বের হওয়ার ঘটনায় সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
কৃষকদের দাবি, শুধু ক্ষতিপূরণের আশ্বাস নয়; হলুদ ট্যাগধারী বীজের সরবরাহব্যবস্থা, ডিলারদের ক্রয়-বিক্রয় হিসাব, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের কাছে সরবরাহের নথি এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমির প্রকৃত ক্ষতি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। পাশাপাশি আগাম শীষ বের হওয়ার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।