স্টাফ রিপোর্টার:
সরকারি পরিপত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে বাণিজ্য মেলা আয়োজন নিষিদ্ধ থাকার বিধান এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার নথি প্রশাসনের কাছে পাঠানোর পরও রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে বাণিজ্য মেলার প্রস্তুতি চলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি বিধিবিধান, আদালতের নির্দেশনা এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানতে চাইছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শহিদুল ইসলাম এবং মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহিমা বিনতে আখতার। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম ও বিদ্যালয়ের সভাপতি মো. মশিউর রহমানের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তাঁদের বক্তব্য, অনুমতিসংক্রান্ত নথি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের বিষয়ে সরকারি বিধান থাকার পরও সেখানে মেলার প্রস্তুতি কীভাবে এগোচ্ছে? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যদি মেলার অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে জানিয়ে থাকেন, তাহলে মাঠে প্রস্তুতি চলার বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের কাছে সংশ্লিষ্ট নথি পাঠানোর পর বিষয়টি যাচাই করে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও স্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
সরকারি পরিপত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন নিষিদ্ধ
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-৭ শাখা থেকে ২০২২ সালের ২৯ জুন ‘মেলা পরিপত্র, ২০২২’ জারি করা হয়। পরিপত্রের স্মারক নম্বর ২৬.০০.০০০০.১০৬.৮৬.০৮৬.১৫.১১১। এতে ৫(চ) ধারায় বলা হয়েছে, “কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন করা যাবে না।”
পরিপত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়ে যে বিধান উল্লেখ করা হয়েছে, তা কেশরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে প্রস্তাবিত আয়োজনের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা প্রয়োজন। পরিপত্রটি কার্যকর থাকা এবং আয়োজনটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলে এর বিধান অনুসরণ করা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব।
এ কারণে কেশরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে বাণিজ্য মেলার প্রস্তুতি নেওয়ার আগে আয়োজকরা কোন আইনি ভিত্তিতে মাঠটি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছেন, কোনো অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছে কি না এবং দেওয়া হয়ে থাকলে তা সরকারি পরিপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ মূলত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, শরীরচর্চা, খেলাধুলা ও অন্যান্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়। সেখানে বাণিজ্য মেলার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলে মাঠের ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
হাইকোর্টের নির্দেশনার নথি পাঠানো হয়েছে প্রশাসনের কাছে
বরিশালের কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে বাণিজ্য মেলার আয়োজনসংক্রান্ত রিট পিটিশন নং ৬২৫৯/২০২৬-এর বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার নথিও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বরিশালের ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে বাণিজ্য মেলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালতের নির্দেশনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়।
কেশরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে মেলার প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে আসায় বরিশালের মামলার নথি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের আলোকে আইনগত অবস্থান যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে বরিশালের মামলায় দেওয়া আদালতের আদেশ কেশরহাটের আয়োজনের ওপর সরাসরি প্রযোজ্য কি না, তা নির্ভর করবে আদেশের সুনির্দিষ্ট ভাষা, নির্দেশনার পরিধি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর এর প্রযোজ্যতার ওপর।
এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের ওপর যে বিধান রয়েছে, সেটি সংশ্লিষ্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে কার্যকর কি না, তা যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাইকোর্টের নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে এবং সেই নির্দেশনার সঙ্গে কেশরহাটের পরিস্থিতির কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা মূল আদেশের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট নথি প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়ে থাকলে সেগুলো পর্যালোচনা করে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্তের কারণ জনসমক্ষে স্পষ্ট করা জরুরি বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
প্রধান শিক্ষককে চাপ দিয়ে অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ
১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কেশরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠটি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সমাবেশ, জাতীয় সংগীত পরিবেশন, শরীরচর্চা ও খেলাধুলার গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেই মাঠে বাণিজ্য মেলার প্রস্তুতি ঘিরে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলামকে চাপ প্রয়োগ করে মেলার অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিস্থিতির চাপে তিনি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য, অনুমতিপত্রের কপি এবং সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করা হয়ে থাকলে সেটি কী ধরনের নথি, কোন শর্তে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে এবং বিদ্যালয়ের পরিচালনা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত কী ছিল, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নাকি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ছিল—সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। একই সঙ্গে চাপ প্রয়োগের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
প্রধান শিক্ষককে চাপ দিয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা উদ্বেগজনক। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য প্রয়োজন।
ইউএনওর বক্তব্যের পরও মাঠে প্রস্তুতি চলার অভিযোগ
মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিমা বিনতে আখতারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদকের কাছে জানান, স্কুলের মাঠ নিয়ে শুরু থেকেই তাঁর সন্দেহ ছিল। তিনি আরও জানান, মেলার অনুমতিপত্র এখনো দেওয়া হয়নি।
একই কথোপকথনে তাঁকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন নিষিদ্ধ থাকার বিধান এবং হাইকোর্টের নির্দেশনার বিষয়ে জানানো হলে তিনি সংশ্লিষ্ট নথি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন। নথি পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, আইন অমান্য করে কোনোভাবেই মেলার অনুমতি দেওয়া যাবে না।
ইউএনওর এই বক্তব্যের পর মাঠে মেলার প্রস্তুতি চলার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলার অনুমতি দেওয়া না হয়ে থাকে, তাহলে মাঠে প্রস্তুতি গ্রহণের পেছনে কারা রয়েছেন এবং কী ধরনের অনুমতি বা সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ চলছে, তা জানা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাঠে প্রস্তুতি চলার অর্থই যে উপজেলা প্রশাসনের অনুমোদন রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রস্তুতির ধরন, আয়োজকদের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
ইউএনও সংশ্লিষ্ট নথি পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে থাকলে, নথি পাওয়ার পর তাঁর দপ্তর কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটিও জানানো প্রয়োজন। কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে তার বিবরণ এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রকাশ করা হলে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর হতে পারে।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর সরকারি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র, হাইকোর্টের নির্দেশনার নথি এবং এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য না পাওয়ায় কেশরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে মেলার প্রস্তুতির বিষয়ে জেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। মেলার অনুমতি, মাঠ ব্যবহারের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা-ও জানা যায়নি।
জেলা প্রশাসকের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশিত। সরকারি পরিপত্র ও আদালতের নির্দেশনার নথি তাঁর নজরে আসার পর বিষয়টি যাচাই করা হয়েছে কি না? মেলার আয়োজনের বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক তদন্ত বা অনুসন্ধান চলছে কি না? মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকলে তার আইনগত ভিত্তি কী? আর অনুমতি না দেওয়া হয়ে থাকলে প্রস্তুতি চলার বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে ঘটনাটির প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হবে। জেলা প্রশাসকের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ
কেশরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম এবং বিদ্যালয়ের সভাপতি মো. মশিউর রহমানের নাম এ ঘটনায় সামনে এসেছে। তাঁদের ভূমিকা, মাঠ ব্যবহারের বিষয়ে বিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত এবং মেলার আয়োজকদের সঙ্গে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রধান শিক্ষককে চাপ দিয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে মো. মশিউর রহমান মাঠ ব্যবহারের অনুমতি বা মেলার প্রস্তুতি সম্পর্কে কী জানেন, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত কী ছিল এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানা প্রয়োজন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া অনুমতিপত্রের প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন। তাই সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নিয়ে নথিপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।
বরিশালের ঘটনা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন
বরিশালের কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে বাণিজ্য মেলা আয়োজনসংক্রান্ত বিরোধের পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রত্যাহার করে ওএসডি করা এবং দুইজন সিনিয়র সচিবের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য সামনে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আদেশ, তদন্ত কমিটির কার্যপরিধি, তদন্তের ফলাফল এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার বা ওএসডি করা কিংবা তদন্ত কমিটি গঠন করা মানেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়।
বরিশালের ঘটনার সঙ্গে কেশরহাটের পরিস্থিতির তুলনা করতে হলে দুটি ঘটনার আইনি ও প্রশাসনিক পার্থক্য বিবেচনায় নিতে হবে। তারপরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত নথি যাচাই এবং আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।
রাজশাহীর প্রশাসনের ক্ষেত্রেও তাই মূল প্রশ্ন হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধান ও আদালতের নির্দেশনার আলোকে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে কী আইনি ভিত্তি রয়েছে। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা হয়ে থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ শুধু খালি জায়গা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ। সেখানে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি চললে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সমাবেশ ও অন্যান্য কার্যক্রমে কী প্রভাব পড়বে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
মেলার আয়োজনের কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। একই সঙ্গে মাঠ ব্যবহারের বৈধতা, নিরাপত্তা, জনস্বার্থ এবং প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এদিকে, একটি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিক্ষার্থীদের অধিকার ও জনস্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্রয়োজনে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া হবে।
প্রশাসনের কাছে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
কেশরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে মেলার প্রস্তুতির অভিযোগের বিষয়ে এখন কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। মাঠ ব্যবহারের জন্য কোনো অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছে কি না, দিলে কোন কর্তৃপক্ষ দিয়েছে এবং কোন বিধানের ভিত্তিতে দিয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষককে চাপ প্রয়োগ করে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা দরকার।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেলার অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে মাঠে প্রস্তুতি চলার অভিযোগের সম্পর্ক কী, সেটিও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট নথি পাওয়ার পর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানানো হলে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
সরকারি পরিপত্র কার্যকর থাকলে তার বিধান অনুসরণ করতে হবে। আদালতের নির্দেশনা প্রযোজ্য হলে সেটিও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে মূল আদেশ ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই ছাড়া কোনো পক্ষকে আদালতের নির্দেশনা অমান্যকারী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
কেশরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে মেলার প্রস্তুতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এ মুহূর্তে এগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি পরিপত্র রয়েছে, হাইকোর্টের নির্দেশনার নথি পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, আর ইউএনও জানিয়েছেন মেলার অনুমতিপত্র দেওয়া হয়নি। এরপরও মাঠে প্রস্তুতি চলার অভিযোগের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথি সামনে এলেই বিষয়টির প্রকৃত অবস্থা পরিষ্কার হবে।
জনস্বার্থে এখন প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিষয়টি যাচাই করে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও প্রচলিত আইন বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।