৩ বছরের শিশুকে চিকিৎসা না দিয়েই হাসপাতাল ত্যাগের অভিযোগ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে

মোঃ শামীম হোসেন সিকদার:

বান্দরবান সদর হাসপাতালে তিন বছরের এক গুরুতর আহত শিশুকে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসক হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে ডা. দেবরাজ বৈদ্যের বিরুদ্ধে। এক্স-রে রিপোর্ট না দেখে এবং আহত শিশুটির চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে হাসপাতাল ত্যাগ করার অভিযোগে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন শিশুটির বাবা মো. সেলিম।

ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৯ আগস্ট দুপুরে বান্দরবান সদর হাসপাতালে। এ ঘটনায় ৩১ আগস্ট বান্দরবান সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত আবেদন করে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিশুর বাবা। আবেদনের অনুলিপি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসক এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বান্দরবান সদর ইউনিয়নের গোয়ালিয়াখোলা গ্রামের বাসিন্দা মো. সেলিমের তিন বছরের শিশুকন্যা আফিয়া গত ২৯ আগস্ট সকাল আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে বাসার একটি টেবিল থেকে পড়ে যায়। এতে তার হাতে গুরুতর আঘাত লাগে। শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসপাতালে জরুরি বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী টিকিট সংগ্রহের পর শিশুটিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. দেবরাজ বৈদ্যের কাছে নেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে শিশুটিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসক তার হাত ভেঙে গেছে বলে জানান। পরে দ্রুত এক্স-রে করানোর পরামর্শ দেন তিনি।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিবারের সদস্যরা দ্রুত শিশুটির এক্স-রে করান। তবে এক্স-রে করার পর রিপোর্ট হাতে আসার আগেই চিকিৎসক হাসপাতাল ত্যাগের প্রস্তুতি নেন বলে অভিযোগ করেছেন শিশুটির স্বজনরা।

তাদের দাবি, দুপুর আনুমানিক ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে চিকিৎসক হাসপাতাল থেকে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে শিশুটির স্বজনরা তাকে এক্স-রে রিপোর্টটি দেখে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। ওই সময় আহত শিশুটি প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছিল এবং কান্নাকাটি করছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বজনদের অভিযোগ, তারা চিকিৎসকের কাছে বারবার অনুরোধ করলেও তিনি এক্স-রে রিপোর্ট দেখেননি এবং শিশুটির পরবর্তী চিকিৎসা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা না দিয়েই হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এতে চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন শিশুটির পরিবারের সদস্যরা।

ভুক্তভোগী শিশুর বাবা মো. সেলিমের অভিযোগ, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তারা দ্রুত এক্স-রে করিয়েছিলেন। কিন্তু রিপোর্ট হাতে আসার পর চিকিৎসককে না পাওয়ায় তারা বিপাকে পড়েন। তিন বছরের একটি শিশু গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে থাকার পরও এ ধরনের আচরণে তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে জানান তিনি।

দুর্গম এলাকার রোগীদের ভোগান্তির অভিযোগ

এদিকে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বান্দরবান একটি দুর্গম পার্বত্য জেলা। জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা থেকে পাহাড়ি-বাঙালি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে বান্দরবান সদর হাসপাতালে আসেন। অনেক রোগীকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জেলা সদরে পৌঁছাতে হয়।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ওপর প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সেখানে কোনো রোগী, বিশেষ করে শিশু ও গুরুতর আহত রোগী যথাসময়ে চিকিৎসাসেবা না পেলে তাদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।

তারা বলেন, দুর্গম এলাকার মানুষ অনেক সময় উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকেন। জেলা সদর হাসপাতালই তাদের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। ফলে হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের দায়িত্বশীল ও মানবিক আচরণ করা প্রয়োজন। কোনো চিকিৎসকের দায়িত্বে অবহেলার কারণে রোগীকে ভোগান্তিতে পড়তে হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা উচিত।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

এ ঘটনায় শিশুটির বাবা মো. সেলিম গত ৩১ আগস্ট বান্দরবান সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তিনি ডা. দেবরাজ বৈদ্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

লিখিত আবেদনে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কোনো রোগী এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার না হন, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অভিযোগের অনুলিপি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, বান্দরবান জেলা প্রশাসক এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. দেবরাজ বৈদ্যের বক্তব্য জানা যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।

তিন বছরের শিশু আফিয়ার চিকিৎসাসেবা নিয়ে ওঠা এ অভিযোগে এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা প্রত্যন্ত এলাকার রোগী ও তাদের স্বজনদের যেন কোনো ধরনের অবহেলা বা হয়রানির শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *