মোঃ আনজার শাহ
কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবার। এর মধ্যেই অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোনে গালিগালাজ ও হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগ তুলেছেন নিহতের বাবা। পাশাপাশি অপ্রতিম ও তার মাকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে অপপ্রচার। এসব ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার কথা জানিয়েছেন অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। তবে সেই জিডির অস্তিত্ব নিয়েই সদর দক্ষিণ মডেল থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যে দেখা দিয়েছে স্পষ্ট বিভ্রান্তি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) অপ্রতিমের বাবা ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপে এসব তথ্য উঠে আসে।
গালিগালাজ ও অনলাইন অপপ্রচারের অভিযোগ
কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার জানান, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে একটি গ্রামীণফোন নম্বর থেকে তার মোবাইলে কল আসে। পরিচয় জানতে চাইলে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর অপর প্রান্ত থেকে তাকে অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। তিনি বলেন, মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন আসে, কিন্তু পরিচয় দেওয়া হয় না; সেদিন ফোন করে খুব খারাপ ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অপ্রতিম ও তার মায়ের নামে একাধিক ভুয়া ফেসবুক ও টিকটক আইডি খুলে চালানো হচ্ছে নানা অপপ্রচার। বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও করা হচ্ছে অশোভন আচরণ।
জিডির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ তার বাসায় গিয়েছিল, তখনই বিষয়টি জানানো হয়েছিল। এদিন সকালে ওসিও তাকে ফোন করেছিলেন, তখনও তিনি বিষয়টি অবহিত করেন। তার ভাষ্যে, ছেলের নামে অসংখ্য টিকটক ও ফেসবুক আইডি এবং স্ত্রীর নামে প্রায় ১২-১৩টি আইডি খোলা হয়েছে এসব নিয়ে থানায় গিয়ে অনলাইনে জিডি করেছেন তিনি। ২১ তারিখ হুমকি পাওয়ার পর থানায় গিয়ে এই অনলাইন জিডি করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা ও ওসির পরস্পরবিরোধী বক্তব্য:
এ বিষয়ে সদর দক্ষিণ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও অপ্রতিম হত্যা মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা রাজিব আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, “এক মিনিট পরে ফোন দিচ্ছি,” এরপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। প্রায় আধা ঘণ্টা পরও তিনি ফোন না করায় প্রতিবেদক পুনরায় যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এবং এ বিষয়ে ওসির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
তবে একই বিষয়ে সময় সংবাদের কাছে রাজিব আহমেদ জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার ভাষ্যমতে, সাইবার বুলিং এবং বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে অশোভন আচরণের অভিযোগে অপ্রতিমের বাবা জিডি করেছেন এবং বিষয়টি তদন্তাধীন।
অন্যদিকে সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা জানান। তিনি বলেন, অপ্রতিম হত্যার পর একটি মামলা হয়েছে, কিন্তু তার থানায় নতুন কোনো জিডি বা অভিযোগ জমা পড়েনি। এমন কিছু পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এভাবে একই থানার দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা—নিহতের বাবা ও তদন্ত কর্মকর্তা জিডির কথা বললেও, ওসি জানাচ্ছেন এমন কোনো নথি তার কাছে নেই।
যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড:
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান এবং বর্ডার গার্ড হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বেরিয়ে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় সে। ওই দিনই তার বাবা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় অপ্রতিমের মরদেহ। সেই রাতেই অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন তার বাবা।
পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ ও অপ্রতিমের মুঠোফোনের সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসানকে (১৬) এবং সন্দেহের ভিত্তিতে মো. সিয়ামকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
২০ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, আইফোন ছিনিয়ে নিতে অপ্রতিমের মাথায় বাঁশ ও লাঠি দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়, এরপর মুঠোফোন নিয়ে পালিয়ে যায় তিন আসামি। সিয়াম বাদে গ্রেপ্তার বাকি তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় আদালতের নির্দেশে ফাহাদ ও কামরুলকে পাঠানো হয়েছে গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে, অন্য দুই আসামি রয়েছে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান জানান, মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে এসআই সাইফুল ইসলামের পরিবর্তে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পরিদর্শক রাজিব আহমেদকে। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।