মোঃআনজার শাহ
বরুড়া জনকল্যাণ সমিতির নবনির্বাচিত কার্যকরী পরিষদের অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আন্তরিকতা, প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরে সবাইকে মুগ্ধ করলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। উপস্থিত নেতৃবৃন্দ, সমিতির সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শুরু করা তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দেশপ্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং বরুড়ার সার্বিক উন্নয়নের বিস্তৃত পরিকল্পনা।
“সমিতি যেন রাজনীতির বাইরে থাকে” হৃদয়ছোঁয়া আহ্বান:
বক্তব্যের শুরুতেই মন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন এক তিক্ত বাস্তবতার কথা কুমিল্লার গর্বের প্রতীক ছিল ড্রাইভার্স সমিতি ও মালিক সমিতির মতো ভালো ভালো সংগঠন, কিন্তু রাজনীতি ও স্বার্থের সংঘাতে সেগুলো টিকে থাকতে পারেনি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বরুড়া জনকল্যাণ সমিতি যেন এই ভাগ্য এড়িয়ে দল-মত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার জন্য একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে টিকে থাকে। নিজের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, জনকল্যাণই হোক সবার একমাত্র প্রাধান্য।
গর্বের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরলেন মন্ত্রী:
আবেগঘন কণ্ঠে মন্ত্রী তুলে ধরেন তাঁর পারিবারিক মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস। তিনি জানান, তাঁর পরিবারের দুইজন সদস্য তাঁর আপন খালু সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর পরিবার বন্দিদশাসহ নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছে বলেও স্মৃতিচারণ করেন তিনি। তিনি জানান, তাঁর বাবা রাজনীতির প্রয়োজনে সংগঠন গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন, কারণ সংগঠন ছাড়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিমুক্ত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার:
শিক্ষা প্রসঙ্গে মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠনে তিনি কখনো দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দেননি; বরং যাঁরা প্রতিষ্ঠাতা বা শিক্ষানুরাগী এবং সমাজে গ্রহণযোগ্য, তাঁদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তিনি শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তাঁরা শিক্ষার মান উন্নয়নে আরও বেশি সময় ও শ্রম দেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন, শিক্ষাক্ষেত্র নিয়ে কখনো রাজনীতি করবেন না।
উন্নয়নের রূপরেখা: টেকনিক্যাল কলেজ, হাসপাতাল ও সড়ক সম্প্রসারণ:
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বরুড়ায় প্রতিষ্ঠিত টেকনিক্যাল কলেজকে আরও কার্যকর করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে এবং কুমিল্লায় একটি সম্পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) স্থাপনের জন্য ইতিমধ্যে জমি চূড়ান্ত করা হয়েছে, চলতি বছরের মধ্যেই যার টেন্ডার সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে সুখবর দিয়ে মন্ত্রী জানান, বরুড়ায় ৩৫ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটি ১০১ শয্যাবিশিষ্ট নির্মাণকাজ শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে, যা এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করবে।
সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লালমাই থেকে বরুড়া সড়কটি বর্তমান ১৮ ফুট থেকে ২৪ ফুটে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং চলতি ডিসেম্বরের মধ্যে এর টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে তিনি জানান। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা একটি সেতুর টেন্ডার প্রক্রিয়াও সম্প্রতি সম্পন্ন হয়েছে বলে সুখবর দেন তিনি।
মাদকের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান, সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান:
মাদকবিরোধী অবস্থান তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি সবসময় মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এসেছেন এবং প্রতি ইউনিয়ন-ওয়ার্ডে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পুলিশের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, বরুড়াকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
কুমিল্লা বিভাগ ও বরুড়া জেলার স্বপ্ন:
উপস্থিত একজনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, কুমিল্লা ভবিষ্যতে বিভাগ হিসেবে ঘোষিত হবে। এ লক্ষ্যে কুমিল্লায় একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্স এবং ১০০০ শয্যার হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়ে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ সহযোগীদের প্রতি:
বক্তব্যের শেষে মন্ত্রী তাঁর নিরলস সহযোগী কায়সার আলম সেলিমসহ ব্যক্তিগত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেন কল্লোল ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যাঁরা প্রতি সপ্তাহে সময় দিয়ে জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।
সবশেষে মন্ত্রী উপস্থিত সবার দোয়া কামনা করে বলেন, প্রতিশ্রুত উন্নয়নকাজগুলো বাস্তবায়নে তিনি সর্বাত্মক আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাবেন এই অঙ্গীকারই যেন আজকের অনুষ্ঠানকে করে তুলেছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক।