জেলা প্রতিনিধি:
কুষ্টিয়ায় দুই যুবককে আটকের সময় তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না দাবি করে ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ তুলেছেন তাদের স্বজনরা। আটকের সময়কার ভিডিও ফুটেজে এর প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তারা। তবে অভিযোগটি অস্বীকার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, দুই যুবকের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের পরই তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুরে কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল্লাহর স্ত্রী মিথিলা খাতুন। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন গ্রেপ্তারকৃত আরেক যুবক আরিফুল ইসলামের ভাগনি ইতি খাতুন।
গ্রেপ্তার দুই যুবক হলেন কুমারখালী উপজেলার শালঘর মধুয়া গ্রামের হাসেন আলী গোপালের ছেলে আরিফুল ইসলাম আরিফ (২৮) এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার দুর্বাচারা গ্রামের রাহাদ আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ (২৮)।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মিথিলা খাতুন বলেন, গত ৬ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘কুষ্টিয়ায় দুটি পিস্তল ও ১৮ রাউন্ড গুলিসহ আটক ২’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে আরিফুল ইসলাম ও আব্দুল্লাহকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। তবে তাদের দাবি, আটকের সময় দুই যুবকের কারও কাছেই কোনো অস্ত্র ছিল না।
মিথিলা খাতুনের অভিযোগ, ডিবি পুলিশের এসআই জনি প্রথমে আরিফুল ইসলামকে বংশীতলা মোড় থেকে আটক করেন। পরে ডিবি পুলিশের সদস্যরা দুর্বাচারা বাজারে গিয়ে আব্দুল্লাহকে জনসম্মুখে আটক করেন। এ সময় স্থানীয় লোকজন বাধা দিলে পুলিশ কোনো অস্ত্র দেখাতে পারেনি এবং কেন তাকে আটক করা হচ্ছে, তারও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, আটকের সময়কার ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে এবং ওই ফুটেজে দুই যুবকের কাছে কোনো অস্ত্র দেখা যায় না বলে তারা দাবি করছেন।
মিথিলা খাতুন আরও অভিযোগ করেন, দুর্বাচারা গ্রামের জাহাঙ্গীর কবির লিপটন ও টাইগার মামুনের সঙ্গে তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জের ধরে তাদের স্বামী আব্দুল্লাহকে ডিবি পুলিশের মাধ্যমে আটক করানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মিথিলা বলেন, ‘আমার স্বামীর নামে কোনো মামলা নেই। তাহলে তাকে কেন তুলে এনে অস্ত্র দিয়ে চালান দেওয়া হলো? প্রশাসনের কাছে আপনাদের মাধ্যমে আমরা এই প্রশ্নের উত্তর চাই।’
সংবাদ সম্মেলনে জাহাঙ্গীর কবির লিপটন ও টাইগার মামুনের বিরুদ্ধেও অপহরণ, চাঁদাবাজি, অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোসহ বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লিখিত বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, ২০২৫ সালের ৬ জুন বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ সেনাবাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর লিপটন জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে যান। পরে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে আব্দুল্লাহ ও আরিফুলকে গ্রেপ্তার করানোর অভিযোগও করা হয়।
টাইগার মামুনের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। পাশাপাশি প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে হয়রানি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগও তোলা হয়।
এ ছাড়া আরিফুল ইসলামকে ২০২৩ সালের দিকে ঢাকায় র্যাব একাধিক অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল বলে দাবি করেন স্বজনরা। পরে এলাকাবাসীর মানববন্ধনের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং শুধু ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের মামলায় তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে বলেও জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে মিথিলা খাতুন বলেন, প্রকৃত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে। যারা অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, তার স্বামীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকা সত্ত্বেও তাকে গ্রেপ্তার করে অস্ত্র মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তও দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলন থেকে গ্রেপ্তার দুই যুবককে দ্রুত আইনি সহায়তা দিয়ে মুক্তির ব্যবস্থা, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং গ্রেপ্তারকারী ডিবি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
অভিযোগের বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুকুল ইসলাম বলেন, ডিবি পুলিশ কাউকে অর্থের বিনিময়ে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর মতো কাজ করে না। এসব অভিযোগকে তিনি ‘ভুয়া’ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা হিসেবে দাবি করেন।
আটকের সময় ভিডিও ফুটেজ ধারণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কে, কখন, কোথায় এবং কীভাবে ভিডিও করেছে, তা তাদের জানা নেই। তবে কাউকে ভিডিও করতে পুলিশ কখনো বাধা দেয় না।
ওসি ফারুকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তাদের কাছ থেকে অস্ত্র পেয়েছি, তাদের গ্রেপ্তার করেছি এবং আদালতে পাঠিয়েছি।’
সংবাদ সম্মেলনে আরিফুলের স্ত্রী বেবি, বড় ভাবি মিনারা বেগম, মা রাবেয়া খাতুন, বড় বোন নাছিমা খাতুন, রূপসী খাতুনসহ দুই পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।