স্বাধীন আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেধাবী ও দক্ষ কর্মী যুক্তরাষ্ট্রে আনা এখন সময়ের দাবি। তাঁর বক্তব্যে অভিবাসন নীতিতে এক ধরনের নরম অবস্থান দেখা গেছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের আগের কঠোর অবস্থান থেকে স্পষ্ট ভিন্ন।
ফক্স নিউজের ইনগ্রাহাম অ্যাঙ্কেল অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু খাতে এমন জটিল ও বিশেষায়িত কাজ রয়েছে, যা স্থানীয় কর্মীদের পক্ষে দ্রুত শেখা বা সম্পাদন করা সম্ভব নয়। “আমাদের কিছু ক্ষেত্রে মেধাবী মানুষ দরকার। আমেরিকানরা অনেক কিছু পারে, কিন্তু সব নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে বাইরের মেধা আনতে হবে,”—বলেন ট্রাম্প।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা খাতের মতো জটিল কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বেকার থাকা স্থানীয় আমেরিকানদের হঠাৎ প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা সম্ভব নয়। তাই এসব ক্ষেত্রে বিদেশি দক্ষ কর্মীর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়, যখন তাঁর সরকার গত কয়েক বছরে এইচ-১বি ভিসা প্রোগ্রাম সীমিত করতে নানা বিধিনিষেধ জারি করেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর বিদেশি কর্মী নিয়োগে প্রশাসনিক জটিলতা ও উচ্চ ফি নির্ধারণের কারণে মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থার সমালোচনা বাড়ছিল।
কঠোরতা থেকে নমনীয়তার দিকে
প্রশাসনের আগের অবস্থান ছিল এইচ-১বি ভিসাকে “দুর্ব্যবহারের সুযোগ” হিসেবে দেখা। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্ট নিজেই বললেন, “আমাদের দেশে পর্যাপ্ত মেধা নেই এমন নয়, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্যিই আমাদের বাইরের বিশেষজ্ঞ দরকার।”
এই মন্তব্য ট্রাম্পের আগের বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রথম মেয়াদে তিনি বারবার বলেছিলেন, বিদেশি ভিসাধারীরা আমেরিকান চাকরি কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা খাতে কর্মী সংকট প্রকট হয়ে ওঠায় প্রশাসনও নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে।
এইচ-১বি ভিসা ফি বৃদ্ধি ও নতুন নিয়ম
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন ‘এইচ-১বি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রোগ্রাম’ সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ ঘোষণা করে। ‘কিছু নন-ইমিগ্র্যান্ট কর্মীর প্রবেশে বিধিনিষেধ’ শীর্ষক ঘোষণায় বলা হয়, ২৫ সেপ্টেম্বরের পর জমা দেওয়া নির্দিষ্ট এইচ-১বি আবেদনগুলোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১,০০,০০০ মার্কিন ডলার ফি দিতে হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর পরে ব্যাখ্যা করে জানায়, নতুন ফি কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য, যারা ২১ সেপ্টেম্বরের পরে নতুন আবেদন জমা দেবে বা এইচ-১বি লটারিতে অংশ নেবে। বর্তমানে যারা এই ভিসায় কাজ করছেন বা এর আগে আবেদন করেছেন, তাদের ওপর নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
এছাড়া ২০২৬ সালের লটারিতে অংশগ্রহণের জন্য জমা দেওয়া আবেদনগুলোও নতুন এই ফি কাঠামোর আওতায় পড়বে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
ভারতীয়দের জন্য বড় প্রভাব
বিশ্বব্যাপী এইচ-১বি ভিসাধারীদের মধ্যে ভারতীয় পেশাজীবীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রযুক্তি খাতে দক্ষ প্রোগ্রামার, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসক, ও গবেষক হিসেবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাই ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থানকে ভারতীয় প্রবাসী সমাজ ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছে।
ভারতের বেশ কয়েকটি আইটি প্রতিষ্ঠান—যেমন ইনফোসিস, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), উইপ্রো প্রভৃতি—প্রতি বছর হাজারো কর্মীর জন্য এই ভিসায় আবেদন করে থাকে। নতুন ফি কাঠামো তাদের জন্য বাড়তি চাপ বয়ে আনলেও ট্রাম্পের মন্তব্যে এক ধরনের আশার আলো দেখছেন অনেকেই।
প্রযুক্তি খাতে স্বস্তির ইঙ্গিত
মার্কিন প্রযুক্তি খাত, বিশেষ করে সিলিকন ভ্যালি, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের কড়াকড়ির সমালোচনা করে আসছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো বলছিল, বিশ্বমানের সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও গবেষক ছাড়া উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত করেছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই নরম সুর সম্ভবত নির্বাচনী কৌশলের অংশ। কারণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের এই সময়ে প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি পূরণ না হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, ফি বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জটিলতা বজায় থাকলে কেবল বক্তব্যে নমনীয়তা এনে লাভ হবে না—বাস্তবে ভিসা নীতির সংস্কার দরকার।
তবুও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে এমন বক্তব্য নিঃসন্দেহে এক নতুন বার্তা—যে, দক্ষ মেধাবীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়।