মোহাম্মদ হোসেন সুমন:
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় প্রণীত যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (জেআরপি)-২০২৬ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কক্সবাজারভিত্তিক সিভিল সোসাইটি সংগঠন সিসিএনএফ। সংগঠনটির দাবি, রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকে স্থানীয় ও জাতীয় এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও জেআরপি বাস্তবায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ কমিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ নির্ধারণ করাকে তারা স্থানীয়করণ নীতি ও সরকারি নির্দেশনার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে।
সিসিএনএফের প্রকাশিত অবস্থানপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট নবম বছরে পদার্পণ করেছে। বর্তমানে কক্সবাজারে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকট হিসেবে বিবেচিত। ২০১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, দেশীয় সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের চাপ স্থানীয় জনগণের জন্য ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে।
সংগঠনটি মনে করে, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় অর্থায়ন সংগ্রহ ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনায় জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক এনজিও এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোর সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। স্থানীয়করণ (Localization), গ্র্যান্ড বারগেইন (Grand Bargain) এবং চার্টার ফর চেঞ্জ (Charter for Change)-এর মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আলোকে জেআরপিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অবস্থানপত্রে অভিযোগ করা হয়, গত ২০ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জেআরপি-২০২৬ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। অনুষ্ঠানে বক্তা মনোনয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও জাতীয় এনজিও নেতাদের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এ বিষয়ে স্থানীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
সিসিএনএফের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই কক্সবাজারভিত্তিক বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠন জরুরি সহায়তা কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু পরিকল্পনা প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত সীমিত করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাস্তবতা, অভিজ্ঞতা ও জনগণের চাহিদা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
অবস্থানপত্রে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক কিছু এনজিও স্থানীয়করণের বিষয়ে বৈশ্বিক অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে স্থানীয় নেতৃত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এতে স্থানীয় সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নেতৃত্ব বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকে আরও প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় কক্সবাজারের পরিবেশ, বনাঞ্চল, কৃষিজমি, পানি সম্পদ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে সিসিএনএফ উল্লেখ করে, ২০১৯ সালে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো বিদেশি অনুদানের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যয়ের নির্দেশনা দিয়েছিল। অথচ জেআরপি-২০২৬-এ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা স্থানীয় বাস্তবতা এবং সরকারি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সংগঠনটির দাবি।
এ ছাড়া, জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ইউএনওসিএইচএ) পরিচালিত বিভিন্ন তহবিল বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিসিএনএফ। তাদের মতে, সরাসরি স্থানীয় সংগঠনকে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ অর্থ জাতিসংঘ সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় সংগঠনগুলোর জন্য সরাসরি অর্থায়নের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
অবস্থানপত্রে আরও দাবি করা হয়, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা অংশীদার নির্বাচন ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট স্থানীয় সংগঠনের কাছে অধিক পরিমাণ প্রকল্প ও অর্থায়ন কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে অন্যান্য স্থানীয় সংগঠন সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সিসিএনএফ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় টেকসই ও কার্যকর মানবিক সাড়াদান নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় এনজিওগুলোর নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা এবং অংশগ্রহণকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জেআরপি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।