মোঃ আনজার শাহ
কুমিল্লাকে বিভাগ করার দাবি আজ আর নিছক একটি প্রশাসনিক আকাঙ্ক্ষা নয় এটি বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও অধিকার আদায়ের প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। সেই দাবিতে এবার আরও দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা, “কেউ চাক বা না চাক, প্রয়োজন হলে নোয়াখালীকে ছাড়াই কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন করা হবে।”
মন্ত্রীর এই বক্তব্যে কুমিল্লার দীর্ঘদিনের বিভাগ আন্দোলনে যেন নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হয়েছে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, জনগণের দুর্ভোগ লাঘব, আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং ঐতিহাসিক-ভৌগোলিক বাস্তবতার নিরিখে একটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠার দাবি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
১৯৮৯ সাল থেকে অপেক্ষায় কুমিল্লাবাসী:
জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, ১৯৮৯ সাল থেকেই কুমিল্লাবাসী কুমিল্লাকে বিভাগ ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছেন। দেশের পঞ্চম বিভাগ হিসেবে তখন কুমিল্লাকে ‘কুমিল্লা’ নামেই বিভাগ ঘোষণার কথা ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে তাঁর অভিযোগ, নানা ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতার কারণে সে সময় দাবিটি বাস্তবায়িত হয়নি।
গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, এ সময়ে কুমিল্লার প্রভাবশালী কয়েকজন রাজনীতিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলেও বিভাগ বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো প্রয়োজনে নোয়াখালীকে সঙ্গে না নিয়েও কুমিল্লাকে পৃথক বিভাগ হিসেবে বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয়। তাঁর ভাষায়, কোনো পক্ষের আপত্তি বা মতভেদ থাকলেও জনগণের যৌক্তিক দাবিকে অনির্দিষ্টকাল উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সংখ্যাতত্ত্বে এগিয়ে কুমিল্লা, বিশ্লেষণে মন্ত্রী:
কুমিল্লা বিভাগের দাবির পেছনের যুক্তিগুলো তুলে ধরে জাকারিয়া তাহের বলেন, এই দাবি নিছক আবেগনির্ভর কোনো আঞ্চলিক চাওয়া নয়; এর পেছনে রয়েছে জনসংখ্যা, প্রশাসনিক কাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার বাস্তব ভিত্তি। বর্তমান চট্টগ্রাম বিভাগ ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত হওয়ায় এর অন্তর্ভুক্ত জেলাগুলোর মানুষকে বিভাগীয় সেবা পেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় বলে জানান তিনি। কুমিল্লাকে বিভাগ করা হলে এই অঞ্চলের মানুষের জন্য বিভাগীয় সেবা আরও সহজলভ্য হবে এবং সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় কমবে।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুমিল্লার জনসংখ্যা ৬২ লাখ ১১ হাজার ৯১৫ জন, যেখানে নোয়াখালীর জনসংখ্যা ৩৬ লাখ ৫২ হাজার ৫১৫ জন। প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকেও কুমিল্লা এগিয়ে-১টি সিটি করপোরেশন, ১১টি সংসদীয় আসন, ১৭টি উপজেলা, ৯টি পৌরসভা ও ১৯৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত কুমিল্লার বিপরীতে নোয়াখালীতে কোনো সিটি করপোরেশন নেই; রয়েছে ৬টি সংসদীয় আসন, ৯টি উপজেলা, ৮টি পৌরসভা ও ৯৩টি ইউনিয়ন। গ্রামসংখ্যার হিসাবেও কুমিল্লার বিস্তৃতি উল্লেখযোগ্য-৩ হাজার ৬৮৭টি গ্রামের বিপরীতে নোয়াখালীতে গ্রাম রয়েছে ৯৬৭টি।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দিক থেকেও কুমিল্লার অবস্থান শক্তিশালী। এখানে রয়েছে ১টি সেনানিবাস, ১টি ইপিজেড, ১টি ক্যাডেট কলেজ, ১টি শিক্ষাবোর্ড, ১টি মেডিকেল কলেজ, ১টি বাংলাদেশ সার্ভে ইনস্টিটিউট, ১টি আর্মি মেডিকেল কলেজ এবং ১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। নোয়াখালীতেও ১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও কলেজের সংখ্যায় তারা এগিয়ে-কুমিল্লার ১৪টির বিপরীতে নোয়াখালীতে রয়েছে ৪৪টি কলেজ। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে জাকারিয়া তাহের বলেন, কুমিল্লা কেবল জনসংখ্যায় নয়, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায়ও একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক কেন্দ্র।
ঐতিহ্যের নগরী কুমিল্লা:
কুমিল্লার বিভাগ হওয়ার দাবির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমৃদ্ধ ইতিহাসও। প্রাচীন এই জনপদ দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মুঘল আমলেও এ অঞ্চলের প্রশাসনিক গুরুত্ব ছিল, আর ‘রওশনাবাদ’ নামের ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুমিল্লার অতীত গৌরব। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী কৌশলগত অবস্থান কুমিল্লাকে যুগ যুগ ধরে গড়ে তুলেছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে।
বিকেন্দ্রীকরণেই দুর্ভোগ লাঘবের পথ:
জাকারিয়া তাহের আরও বলেন, প্রশাসনিক কাঠামো যত বেশি জনগণের কাছাকাছি থাকে, সরকারি সেবা গ্রহণ ততই সহজ হয়। কুমিল্লাকে বিভাগ করা হলে এখানে গড়ে উঠবে বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সেবাকেন্দ্র, ফলে কুমিল্লাসহ আশপাশের জেলার মানুষকে আর দূরবর্তী চট্টগ্রামে ছুটতে হবে না। তাঁর ভাষায়, কুমিল্লা বিভাগ মানে শুধু একটি নতুন প্রশাসনিক মানচিত্র নয়; এর অর্থ মানুষের সময় বাঁচানো, সেবাকে হাতের নাগালে আনা এবং একটি বিস্তৃত অঞ্চলের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করা।
বঞ্চনার ১৭ বছর পেরিয়ে নতুন আশা:
প্রতিবেদক আনজার শাহের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কুমিল্লার সর্বস্তরের মানুষ বিভাগ বাস্তবায়নের দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন, সভা-সমাবেশ ও কর্মসূচি পালন করে আসছেন। উপদেষ্টা পরিষদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আলোচনা থাকলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রত্যাশার পাশাপাশি জমেছে কিছুটা হতাশাও।
তবে মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের সাম্প্রতিক দৃঢ় ঘোষণা সেই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। কুমিল্লার সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা, ভৌগোলিক গুরুত্ব, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, জনসংখ্যার ব্যাপ্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সব মিলিয়ে কুমিল্লাকে পৃথক বিভাগ করার দাবি যে দীর্ঘদিনের এক ন্যায্য প্রত্যাশা, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এখন কুমিল্লাবাসীর অপেক্ষা কেবল একটি কার্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের। সেই সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিনের এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে কি না, সময়ই দেবে তার উত্তর। তবে মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের দৃঢ় অবস্থান যে কুমিল্লার বিভাগ আন্দোলনে নতুন রাজনৈতিক ও জনআলোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।