ঘাটাইলে পিআইও এনামুল হকের দীর্ঘ কর্মকাল নিয়ে প্রশ্ন

স্টাফ রিপোর্টার:

সরকারি চাকরিতে বদলি নীতিমালা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এনামুল হকের দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, তিনি ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন এবং এখনো একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্তও তিনি ঘাটাইলে কর্মরত ছিলেন। মাঝখানে অন্যত্র দায়িত্ব পালনের সময় বাদ দিলেও একই উপজেলায় তাঁর মোট কর্মকাল প্রায় ১৩ বছর বলে জানা গেছে।

দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এনামুল হকের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, নামসর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখানো, সরকারি বরাদ্দ ভাগবাঁটোয়ারায় কথিত সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সবকটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

২০১১ সালে ঘাটাইলে যোগ, আবারও ফিরে আসেন ২০১৬ সালে

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এনামুল হক ২০১১ সালের ৭ আগস্ট কালিহাতী থেকে বদলি হয়ে ১৬ আগস্ট ঘাটাইলে যোগ দেন। প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে গোপালপুরে বদলি করা হয়।

পরবর্তী সময়ে বগুড়ায় বদলির নির্দেশ দেওয়া হলেও তা স্থগিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর ২০১৬ সালের নভেম্বরে তিনি পুনরায় ঘাটাইলে ফিরে আসেন। ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি টানা প্রায় এক দশক একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন।

ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সরকারি ওয়েবপোর্টালেও বর্তমানে এনামুল হককে পিআইও হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং সেখানে তাঁর যোগদানের তারিখ ১৫ নভেম্বর ২০১৬ উল্লেখ রয়েছে।

কাবিখা, টিআর ও কাবিটা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

এনামুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের বিষয়টি অন্যতম। বিভিন্ন সময়ে টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও কর্মসৃজন কর্মসূচির প্রকল্পে বাস্তবে কাজ না করেই কাগজে-কলমে কাজ দেখানো, অস্তিত্বহীন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া এবং একই স্থানে একাধিকবার প্রকল্প দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।

২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঘাটাইলের কাবিখা প্রকল্পে ২৩৯ দশমিক ৮৫৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দের তথ্য তুলে ধরে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ না করেই সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে অন্তত ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে ওই সময় এনামুল হক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, প্রকল্পগুলোর কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

এরপর ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঘাটাইলের কাবিখা প্রকল্পে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ও অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দ ব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কথিত সিন্ডিকেটের মূলহোতা হিসেবে এনামুল হকের নাম উল্লেখ করা হয়।

কর্মসৃজন প্রকল্পেও অভিযোগ

২০২৪ সালে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে ঘাটাইলের কর্মসৃজন কর্মসূচির প্রকল্পে শ্রমিকদের দিয়ে বাস্তবে কাজ না করিয়ে তাঁদের নামে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বিকাশ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে থাকার অভিযোগও উঠে আসে।

ওই প্রতিবেদনে উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে পিআইও এনামুল হককে প্রকল্পের অনিয়মের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে অভিযোগ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল এবং তিনি নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তদন্তে অর্থ ফেরতের দাবিও রয়েছে

এনামুল হককে ঘিরে ওঠা অভিযোগ শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ নয়—এমন দাবি করা হয়েছে ২০২৫ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।

ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের পর টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তদন্তে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে আসে এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ার পর পিআইওসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সরকারি কোষাগারে ১ কোটি ২৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪০০ টাকা ফেরত নেওয়া হয়।

এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাদের তৎপরতার কথাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন, আদেশ বা সরকারি নথি প্রকাশ্যে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের অভিযোগ

এনামুল হকের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঘাটাইলের প্রধান সড়কে খাদ্যগুদামের বিপরীতে দোকানঘরসহ জমি কেনার অভিযোগের কথা বলা হয়।

ওই প্রতিবেদনে জমির বিক্রেতার বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে অভিযোগের বিষয়ে এনামুল হকের বক্তব্য ছিল, ওই সম্পত্তি কেনার অর্থের সঙ্গে অন্য একটি লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি দোকান থেকে ভাড়া পাচ্ছেন।

অর্থাৎ সম্পদ অর্জন নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর পক্ষ থেকে ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট জমির দলিল, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং তাঁর আয়কর নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাহাড়ি লাল মাটি কাটার সিন্ডিকেটের সঙ্গেও যোগসাজশের অভিযোগ

এনামুল হকের বিরুদ্ধে তাঁর দপ্তরের প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি ঘাটাইলের পাহাড়ি এলাকায় লাল মাটি কাটা ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত একটি কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেজার ও বেকু দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি লাল মাটি কেটে বিক্রির একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। ওই চক্রের নেপথ্যে পিআইও এনামুল হকের প্রভাব ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও প্রভাব খাটিয়ে মাটি কাটার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ঘিরেও প্রভাবের অভিযোগ

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, এনামুল হকের প্রভাব শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাজেও তাঁর কথিত একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক বা সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস, ঘাটাইল খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-এলএসডি) এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে ঘুষ লেনদেনের কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গেও তাঁর যোগসাজশ রয়েছে—এমন অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার কারণ কী?

এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে এনামুল হকের দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার বিষয়টি নিয়ে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস-২০২৫-এর ৭(ক) ধারার কথা উল্লেখ করে বদলিযোগ্য কর্মকর্তাদের একই স্থানে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১০ বছর ধরে একই উপজেলায় একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন এনামুল হক। এর আগে ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্তও তিনি একই উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। সব মিলিয়ে ঘাটাইলে তাঁর কর্মকাল প্রায় ১৩ বছর।

তবে কোনো কর্মকর্তা কতদিন একই কর্মস্থলে থাকবেন বা তাঁকে বদলি করা হবে কি না—এটি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়। তাই নির্দিষ্ট বিধি লঙ্ঘন প্রমাণিত হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে না গিয়ে তাঁর দীর্ঘ কর্মকাল, বদলির ইতিহাস এবং প্রযোজ্য বিধিমালা পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়াই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি স্থানীয়দের

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার ফলে জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কর্মকর্তার একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দের হিসাব, প্রকল্প বাস্তবায়নের নথি, প্রকল্পের ছবি, মাস্টাররোল, বিল-ভাউচার, প্রকল্প পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

স্থানীয়দের মতে, অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেও দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি রয়েছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের নথি ও পূর্ববর্তী তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে দীর্ঘদিনের এসব অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *