কেরানীগঞ্জে অবৈধ গ্যাস সংযোগের অভিযোগ, ঠিকাদার শিরাজের সম্পদের পাহাড়

মেজার চৌধুরী:

ঢাকার কেরানীগঞ্জে বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও আবাসিক এলাকায় অনুমোদনহীন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাব্বির এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মো. শিরাজ হাওলাদারের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস লাইন স্থাপন ও ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীনভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার সঙ্গে জড়িত। এসব সংযোগের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, শিরাজ হাওলাদার একসময় গ্যাস লাইন বসানোর কাজে মাটি কাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে গ্যাস লাইনের ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও সম্পদের উৎস নিয়েও এলাকায় নানা প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান তারা।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কেরানীগঞ্জের গেট ব্রিজ এলাকায় অন্তত তিনটি কারখানায় অনুমোদনহীন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে একই ব্যক্তির মালিকানাধীন দুটি কারখানাতেও অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া বেগুনপট্টি এলাকার একটি কারখানা এবং কদমতলী-বেগুনবাড়ী ব্রিজের নিচে থাকা একটি কারখানাতেও অনুমোদনহীন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর এলাকায় বিসিক শিল্পনগরীর ভেতরে কয়েকটি কারখানায়ও অনুমোদনহীন গ্যাস সংযোগ রয়েছে। একইভাবে মুহুরী পট্টিসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় আবাসিক ভবনেও অনুমোদনহীনভাবে গ্যাস লাইন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব সংযোগ কীভাবে দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাহিদাকে কেন্দ্র করে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনহীন সংযোগ দেওয়ার কাজ করে আসছে। স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে এসব সংযোগ স্থাপন করা হলে তা দেখভাল ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে দীর্ঘদিন চালু থাকা সম্ভব কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

এদিকে মো. শিরাজ হাওলাদারের সম্পদ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কেরানীগঞ্জে তার একটি ছয়তলা ভবন, একটি টিনশেড বাড়ি এবং বিভিন্ন এলাকায় জমি রয়েছে। তার গ্রামের বাড়িতেও আলিশান বাড়ি ও কয়েক বিঘা ফসলি জমি রয়েছে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং এর সঙ্গে তার ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যাস লাইনের ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পরই শিরাজ হাওলাদারের আর্থিক অবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। তবে তার প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ, মালিকানাধীন জমি, ভবন এবং অন্যান্য সম্পদের বৈধ উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি নথি বা নির্ভরযোগ্য আর্থিক হিসাব প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অন্যদিকে শিরাজ হাওলাদারের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজনের অভিযোগ, তিনি শাহবাগ থানা জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সভাপতির পদে রয়েছেন এবং অর্থের বিনিময়ে ওই পদ নেওয়ার কথাও স্থানীয়ভাবে শোনা যায়। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো নথি বা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের দায়িত্বশীলদের বক্তব্য পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে তিনি গ্যাস-সংক্রান্ত ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং অবৈধ সংযোগের অভিযোগ ওঠার পরও তার কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিষয়ে স্থানীয়রা বলছেন, অনুমোদন ছাড়া গ্যাস লাইন ব্যবহার শুধু সরকারি রাজস্বের ক্ষতিই করছে না, শিল্প ও আবাসিক এলাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কারখানা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অননুমোদিতভাবে গ্যাসলাইন স্থাপন করা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সংযোগগুলোর বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে সাব্বির এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মো. শিরাজ হাওলাদারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, “যা পারেন তাই করেন।” এরপর অবৈধ গ্যাস সংযোগ, বিভিন্ন কারখানায় অনুমোদনহীন লাইন স্থাপন এবং তার সম্পদ নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আর কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

এখন কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কথিত এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগের বৈধতা, সংযোগ প্রদানের সঙ্গে কারা জড়িত এবং এর বিপরীতে কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে শিরাজ হাওলাদারের নামে ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের উৎস এবং এসব সম্পদ তার ব্যবসায়িক আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মাধ্যমে যাচাইয়েরও দাবি উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *