গণপূর্তের উপসহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশারকে ঘিরে নানা গুরুতর অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশারকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, বিপুল সম্পদ অর্জন, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে লটারির মাধ্যমে তাঁর কর্মস্থল ভোলা গণপূর্ত বিভাগে হলেও অভিযোগের বড় অংশ তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মকাল এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে ঘিরে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৫ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় এক দশক রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল জাদুঘর ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনার ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের দায়িত্বে ছিলেন আবুল বাশার। ওই সময়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি নিজ এলাকা বরিশালের বাকেরগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। একই সময়ে তাঁর নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে ওঠার অভিযোগও সামনে এসেছে। অনলাইনে প্রকাশিত একাধিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একই ধরনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজধানীর জুরাইন এলাকায় তাঁর পাঁচতলা বাড়ি, নিউ মার্কেটে স্বর্ণের দোকান, বরিশাল শহরে বাড়ি, বাকেরগঞ্জে ইটভাটা এবং কয়েকশ বিঘা জমিসহ নামে-বেনামে অর্ধশতাধিক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, মূল্য, উৎস এবং তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে কথিত সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও মূল্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা চূড়ান্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ

স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, আবুল বাশার বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৭ নম্বর কবাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিল, সভা, সমাবেশ ও জনসভায় তিনি আর্থিক সহায়তা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে স্থানীয়ভাবে তাঁকে দলটির একজন অর্থদাতা হিসেবে পরিচিত করা হতো বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সরকারি দায়িত্ব পালন না করে এলাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুল হাফিজ মল্লিকের পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে আবুল বাশারের নিজের স্বাক্ষর করা একটি লিখিত জবাবের কথা তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, অফিসে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে তিনি নির্বাচনী কার্যক্রমে এলাকায় থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।

অফিসে অনুপস্থিতি নিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগের বিষয়ে গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-২-এর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম আবুল বাশারের কাছে কৈফিয়ত তলব করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে আবুল বাশার নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে লিখিত জবাব দেন বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে দাবি করা হয়েছে। ওই জবাবে তিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির নির্দেশনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নিজ এলাকায় থাকার কথা জানান বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও দাবি করা হয়েছে, নির্বাচনের পর বিজয়ী সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুল হাফিজ মল্লিকের বিজয় সংবর্ধনা ও বিজয় র‌্যালিসহ একটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত জবাব রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের অভিযোগ

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবুল বাশার তাঁর আগের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শুরু করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অর্থ সহায়তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে আবুল বাশারের নিজের কোনো বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। একই ধরনের অভিযোগ সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হলেও এগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দুদকের তথ্য চাওয়ার বিষয়টি সামনে

আবুল বাশারের বিরুদ্ধে অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তথ্য চাওয়ার ঘটনা। সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে জানা যায়, ২০ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে দুদক তাঁর বিষয়ে তথ্য চেয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর চিঠি দেয়।

ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাহাবুব হাসান আবুল বাশারের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, পাসপোর্ট, টিআইএন, চাকরির বেতন ও অন্যান্য সুবিধা, চাকরির বিবরণী এবং ঝিগাতলা অফিসার্স কোয়ার্টার নির্মাণ প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন নথি দুদকের কাছে পাঠান বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে পরবর্তীতে ওই অনুসন্ধান বা তদন্তের চূড়ান্ত ফল কী হয়েছে, আবুল বাশারের বিরুদ্ধে কোনো মামলা, চার্জশিট বা আইনগত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না—এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই দুদকের তথ্য চাওয়াকে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

জমি দখলের অভিযোগ

২০২৫ সালের মার্চে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আবুল বাশারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে কুদ্দুস মিয়া নামে এক ব্যক্তি লিখিত বক্তব্যে তাঁর বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ করেন।

কুদ্দুস মিয়ার অভিযোগ, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আবুল বাশার তাঁর ও তাঁর বোনের ৭০ শতাংশ জমিসহ আশপাশের অন্য ব্যক্তিদের জমি দখল করেছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ওই সংবাদ সম্মেলনের প্রতিবেদনে অভিযোগগুলো তুলে ধরা হয়।

তবে এসব জমির মালিকানা, দখল বা আইনগত অবস্থার বিষয়ে আদালত কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

মাশরাফির সঙ্গে ছবি নিয়েও প্রশ্ন

আবুল বাশারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক হুইপ ও বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার সঙ্গে তাঁর খোশগল্পের একটি ছবির কথাও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীরা ছবিটিকে তাঁর তৎকালীন রাজনৈতিক যোগাযোগের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করছেন।

তবে শুধু কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ছবি থাকা থেকে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রমাণিত হয় না। ছবিটির সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কেও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তের দাবি

আবুল বাশারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া, সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন, জমি দখল এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁর চাকরির নথি, পোস্টিং ও দায়িত্বের বিবরণ, আয়কর ও সম্পদ বিবরণী, জমি ও ব্যবসার মালিকানা, সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি এবং দুদকের অনুসন্ধানের বর্তমান অবস্থা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

বিশেষ করে তাঁর নামে বা সংশ্লিষ্টদের নামে থাকা কথিত বাড়ি, জমি, ইটভাটা, স্বর্ণের ব্যবসা এবং অন্যান্য সম্পদের বৈধ উৎস যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এসব অভিযোগের বিষয়ে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. আবুল বাশারের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।

উল্লেখ্য, আবুল বাশারকে ঘিরে একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে ২০২৫ সালের মার্চ এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সবকটির স্বাধীন ও চূড়ান্ত যাচাই হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট সরকারি তদন্ত, নথিপত্র এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *