চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলী খেলা ১১৭তম আসর সম্পন্ন

কামরুল ইসলাম:

চট্টগ্রামের শতবর্ষী ঐতিহ্যের প্রতীক ও বাঙালির ক্রীড়া-সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ আবদুল জব্বারের বলী খেলার ১১৭তম আসর ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এবারের আসরে চূড়ান্ত পর্বে টানা ২৫ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে রাশেদ বলীকে পরাজিত করে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জন করেন কুমিল্লার বাঘা শরীফ।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেলে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় এই প্রতিযোগিতা। খেলা শুরুর আগে পুরো ময়দানজুড়ে ঢোলের বাদ্য, করতালি এবং দর্শকদের ‘হেইয়্যা হেইয়্যা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পরিবেশ। হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা এক উৎসবমুখর মিলনমেলায় পরিণত হয়।

এবারের বলী খেলায় মোট ১০৮ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। প্রাথমিক রাউন্ডগুলোতে একে একে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে দুইজন বলী—বাঘা শরীফ ও রাশেদ বলী—ফাইনালে উঠে আসেন। ফাইনাল ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল উত্তেজনায় ভরপুর। দুজনই একে অপরকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কৌশলগত লড়াই চালিয়ে যান। তবে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা, শক্তি ও কৌশলের সমন্বয়ে বিজয় ছিনিয়ে নেন বাঘা শরীফ।

খেলার উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। তিনি বেলুন উড়িয়ে ১১৭তম আসরের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘোষণা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসন, মেলা কমিটির কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

উল্লেখ্য, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় বাঙালি যুবকদের শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও আত্মরক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১৯০৯ সালে এই বলী খেলার সূচনা করেছিলেন আবদুল জব্বার সওদাগর। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে আজও প্রতি বছর চট্টগ্রামে এই আয়োজন হয়ে আসছে, যা বর্তমানে শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

এবারের আসরে প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান। তারা উভয়েই বলী খেলার ঐতিহ্য রক্ষায় এমন আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং ভবিষ্যতে এ আয়োজন আরও বৃহৎ পরিসরে করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিজয়ী বাঘা শরীফ কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার ঘারমোড়া ইউনিয়নের মণিপুর গ্রামের বাসিন্দা। ফাইনালে জয় লাভ করে তিনি চতুর্থবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন রাশেদ বলী, যিনি কুমিল্লা সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের নসরাইল গ্রামের বাসিন্দা। তৃতীয় স্থান অর্জন করেন মিটু বলী।

পুরো প্রতিযোগিতাজুড়ে ছিল কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দক্ষতা ও শারীরিক সক্ষমতার অনন্য প্রদর্শনী। দর্শকরাও প্রতিটি লড়াই উপভোগ করেন এবং বিজয়ী ও পরাজিত উভয়কেই উৎসাহ দেন।

চট্টগ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী বলী খেলা কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে আজও টিকে আছে, যা নতুন প্রজন্মকেও শারীরিক কসরত ও ঐতিহ্য চর্চায় অনুপ্রাণিত করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *