চট্টগ্রামে দুই বছরেও উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া ১৪৫ আগ্নেয়াস্ত্র

স্টাফ রিপোর্টার:

চট্টগ্রামে দুই বছরেও উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া ১৪৫ আগ্নেয়াস্ত্র। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র। চট্টগ্রাম: দুই বছর আগে থানা ও পুলিশের স্থাপনায় হামলা-লুটের সময় খোয়া যাওয়া চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কিছু অস্ত্র এখনও অপরাধীদের হাতে রয়ে গেছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে সন্ত্রাসীরা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নগরের ৮ থানাসহ পুলিশের ২৯টি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৬ হাজার ৪৭৮ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়। এর মধ্যে গত দুই বছরে ৭৯৯টি অস্ত্র উদ্ধার করা গেলেও এখনও হদিস মেলেনি ১৪৫টির। পুলিশ বলছে, লুট হওয়া অবশিষ্ট অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে দুই বছর পরও ১৪৫টি লুট হওয়া অস্ত্রের হদিস না মেলায় এসব অস্ত্র ভবিষ্যতে আরও অপরাধে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া গোলাবারুদের মধ্যে ৫৬ হাজার ৮৫৬ রাউন্ড উদ্ধার হয়েছে। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত খোয়া যাওয়া আরও ৮টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনও উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলো কোথায় এবং কার হাতে রয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে। এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর প্রকাশ্যে গুলি চালানো ২৫ অস্ত্রধারী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাদের অনেকেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী। প্রকাশ্যে তাদের হাতে পিস্তল, শর্টগান ও কাটা বন্দুকের মতো আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে। অন্যদিকে লুট হওয়া অস্ত্র যে অপরাধীদের হাতে পৌঁছেছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় তার প্রমাণও মিলেছে। নগরের খুলশী থানার আমবাগান এলাকায় গত ২৫ জুলাই মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী মো. আলমগীরকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালায় পুলিশ।

এ সময় পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনাস্থল থেকে দুটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া পিস্তল দুটি ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। চলতি বছরের ১৬ জুন নগরের কোতোয়ালী থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের একটি পিস্তল ও গুলি এক কাভার্ডভ্যান চালকের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ জুন পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হওয়া একটি ৭.৬২ এমএম পিস্তল পেশাদার ছিনতাইকারী সাইদুর রহমান মাসুম প্রকাশ ব্লেড মাসুমের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ বলছে, লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ হাতবদল হয়ে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের কাছে পৌঁছেছে। আবার কিছু অস্ত্র পরিত্যক্ত অবস্থায়ও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের হিসাবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনায় লুট হওয়া মোট ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৭৯৯টি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ১৪৫টি অস্ত্র। একই সময়ে লুট হওয়া ৮৬ হাজার ৪৭৮ রাউন্ড গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৫৬ হাজার ৮৫৬ রাউন্ড। পুলিশের দাবি, লুট হওয়া অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সিএমপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপকমিশনার বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে পুলিশের মাসিক সভায় নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিট ও থানাগুলোকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অন্যান্য অপরাধবিরোধী কার্যক্রমের পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে প্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সন্দেহভাজনদের নজরদারি এবং বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অস্ত্রগুলোর অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

অপরাধীদের হাতে এসব অস্ত্র পৌঁছে গেলে তা ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। তাই অবশিষ্ট অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে সিএমপি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। সিএমপি সহকারী পুলিশ কমিশনার (সদর) ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনকারী ও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান নিয়মিত চলছে।

ইতোমধ্যে কয়েকজন অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লুট হওয়া অধিকাংশ অস্ত্রই উদ্ধার করা হয়েছে। তবে হাতবদলের মাধ্যমে কিছু অস্ত্র সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের কাছে চলে গেছে। এর মধ্যে কিছু অস্ত্র পরিত্যক্ত অবস্থায়ও উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও যেসব অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জনবল, সরঞ্জাম ও সক্ষমতার ঘাটতিতে লুট হওয়া অস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র অপরাধে ব্যবহারের পাশাপাশি নতুন গ্যাং তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে। অনেক ঘটনায় মামলা হলেও অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ফলে অস্ত্রধারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *