স্টাফ রিপোর্টার:
আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত বলে অভিযোগ ওঠা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কর্মকর্তা মো. ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, কমিশন বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যেই চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত, চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইকবাল কবির এলজিইডিতে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন নেওয়া, ঠিকাদারদের বিল ছাড়ে অর্থ আদায়, নিম্নমানের কাজকে অনুমোদন দেওয়া, কাজ না করেই বিল উত্তোলন এবং ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদকের হাতে নেই।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ইকবাল কবির আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কোটায় এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি পেয়েছিলেন। চাকরিতে যোগদানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের একটি বলয় গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মজীবনের বড় একটি সময় তিনি ঝালকাঠির প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেছেন এবং আমুর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
নলছিটিতে থাকাকালে একাধিক অভিযোগ
ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ওঠে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে অবস্থানকালে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য, নিম্নমানের কাজ, কাজ না করে বিল উত্তোলন এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, নলছিটিতে দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গণশুনানিতেও তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়। একাধিক ভুক্তভোগী তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন নথিপত্র ও প্রমাণপত্র উপস্থাপন করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে দুদকে দুটি মামলাও হয়েছিল। তবে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সেসব অভিযোগ ও মামলা কার্যকরভাবে এগোয়নি বলে তাঁরা দাবি করেছেন। এমনকি দুদকের ফাইল অবৈধ অর্থের বিনিময়ে গায়েব করে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। তবে ফাইল গায়েবের এ দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বদলির আদেশও বাতিলের অভিযোগ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ইকবাল কবিরকে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা থেকে রাজাপুর উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত স্মারক নম্বর ছিল ৪৬০২.০০০০.০০১.৯৯.২৭১.১৮.৯৮০০।
অভিযোগ রয়েছে, ওই বদলির আদেশের পর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি আবার নলছিটি উপজেলায় বহাল থাকতে সক্ষম হন। আমির হোসেন আমুর প্রভাব ব্যবহার করে বদলির আদেশ বাতিল করানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইকবাল কবিরের রাজনৈতিক যোগাযোগ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনাও তিনি অনেক সময় উপেক্ষা করতেন। বদলির আদেশসহ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনেও রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ভাইরালের দাবি
ইকবাল কবিরকে ঘিরে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল প্রকাশ্য ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর ঘুষ গ্রহণের ৪৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা সৃষ্টি হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ওই তদন্ত কার্যকরভাবে এগোয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। ভিডিওটির সত্যতা, প্রেক্ষাপট এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল সম্পর্কে প্রতিবেদকের কাছে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য নেই।
হাজীগঞ্জে নিম্নমানের কাজ নিয়ে উত্তেজনা
ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগের আরেকটি ঘটনা হাজীগঞ্জে কর্মরত থাকার সময়ের। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর হাজীগঞ্জে যোগদানের পরও তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ, বিল ছাড় এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন নিয়ে অভিযোগ ওঠে।
‘আমাদের মাতৃভূমি’র অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল হাজীগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নের এন্নাতলি গ্রামে একটি সড়ক নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কাজের গতি সন্তোষজনক নয়।
অভিযোগের প্রতিবাদে এলাকাবাসী ইকবাল কবির ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ঘেরাও করেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে ইকবাল কবির একটি বাথরুমে আশ্রয় নেন এবং কয়েক ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে সেখান থেকে বের হন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে ওই ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা লিখিত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদকের হাতে নেই।
ঠিকাদারদের বিল ছাড়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ
ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিল ছাড়ের সময় নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে অর্থ দাবি করা হতো। ‘মেসার্স মনোয়ারা এন্ড ফাল্গুনি ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজের মান, বিল প্রস্তুত এবং বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সমঝোতার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হতো। ত্রুটিপূর্ণ বা নিম্নমানের কাজের পরও বিল উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ
ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো কাজ না করেই বিল উত্তোলন এবং ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘আমাদের মাতৃভূমি’কে এসব অভিযোগের কথা জানিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আমির হোসেন আমুর পিএস হিসেবে পরিচিত শাওনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ না করেও বিল উত্তোলন করা হয়েছিল। এসব অর্থের একটি অংশ ভাগাভাগির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের আর্থিক পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সংখ্যা কিংবা সরকারি নথিতে এর প্রমাণ সম্পর্কে প্রতিবেদকের হাতে স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।
‘ক্যাশিয়ার’ পরিচিতি নিয়ে প্রশ্ন
ইকবাল কবিরকে আমির হোসেন আমুর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত করার বিষয়টি নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আমু ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এলজিইডিতে ইকবাল কবিরের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি একাধিকবার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি বদলি ঠেকানো, দায়িত্ব পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
বড় প্রকল্পের পিডি হওয়ার চেষ্টা?
বর্তমানে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত ইকবাল কবির কোটি কোটি টাকা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন আমলার কাছে ধরনা দিয়ে বড় কোনো প্রকল্পের আওতায় প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন।
তাঁদের দাবি, দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগের সুবাদে ইকবাল কবির আবারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে তিনি এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি বা তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্পদের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন
ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে তাঁর আয় ও সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, ঝিনাইদহ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের উকিলপাড়ার দিনমজুর কৃষক মো. রইছ উদ্দিন মোল্লার ছেলে ইকবাল কবির একসময় সাধারণ পরিবারের সন্তান ছিলেন। চাকরিতে যোগদানের পর তাঁর সম্পদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এলাকাবাসীর বক্তব্যের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, বর্তমানে তাঁর নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে। ঢাকায় একাধিক প্লট-ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ঝিনাইদহ সদরে বিপুল পরিমাণ জমি থাকার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বাইরে তাঁর সম্পদ রয়েছে বলেও কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন। এসব সম্পদের একটি অংশ স্ত্রী, সন্তান, শাশুড়ি, মা ও অন্যান্য আত্মীয়ের নামে বা বেনামে কেনা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, মূল্য ও বৈধ-অবৈধ উৎস সম্পর্কে কোনো যাচাই করা দলিল বা সরকারি হিসাব প্রতিবেদকের হাতে নেই।
২০১১ সালে এলজিইডিতে যোগদান
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইকবাল কবির ২০১১ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে এলজিইডির ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ প্রকল্পে অস্থায়ী ভিত্তিতে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আমির হোসেন আমুসহ একাধিক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কারণে বিভিন্ন অভিযোগ কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
যেখানে দায়িত্ব, সেখানেই অভিযোগ—ঠিকাদারদের দাবি
ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী কয়েকজন সাধারণ ঠিকাদারের অভিযোগ, তিনি যেখানেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে ঠিকাদাররা মানববন্ধন ও আন্দোলন কর্মসূচিও পালন করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, একের পর এক অভিযোগ উঠলেও ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রশাসনিকভাবে তিনি এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে দায়িত্ব পেয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতিও পেয়েছেন।
স্ট্যান্ড রিলিজের পরও পদোন্নতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইকবাল কবিরকে সর্বশেষ স্ট্যান্ড রিলিজ বা তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলমান ছিল কি না, সে বিষয়ে এলজিইডির সাধারণ কর্মকর্তারা সুস্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি বলে দাবি করা হয়েছে।
এরপরও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তাঁকে নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত, চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ায় এলজিইডির ভেতরে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি ঘুষ গ্রহণ, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, নিম্নমানের কাজ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর মতো গুরুতর অভিযোগ থাকে, তাহলে এসব অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর পদোন্নতি প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হলো?
তবে অভিযোগ থাকলেই কোনো কর্মকর্তা দোষী প্রমাণিত হন না। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই বিষয়টির প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করবে।
পদোন্নতি ঘিরে এলজিইডিতে আলোচনা
ইকবাল কবিরের পদোন্নতি নিয়ে এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অভিযোগকারীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।
তাঁদের আরও দাবি, গত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে টেন্ডার, প্রকল্প অনুমোদন, নিম্নমানের কাজ এবং ভুয়া বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইকবাল কবির নিজেকে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য প্রতিবেদকের হাতে নেই।
পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
ইকবাল কবিরের পদোন্নতি ঘিরে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাঁদের দাবি, পদোন্নতি নিশ্চিত করতে প্রভাবশালী মহলে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
তবে এ অর্থ লেনদেনের কোনো নির্ভরযোগ্য নথি, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বা স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, তদন্ত প্রতিবেদন বা মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা জানা গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।