জুলাই আন্দোলনে ছেলের মৃত্যু, মর্গে শত শত মরদেহের ভিড়ে পোশাকে শনাক্ত করেন মা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গুলিতে নিহত ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে শত শত মরদেহের ভিড়ে পরনের পোশাক দেখে শনাক্ত করেছিলেন মা তাসলিমা আক্তার। ছেলেকে হারানোর সেই মর্মান্তিক স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। একই সঙ্গে ছেলে হত্যার বিচার দাবি করেন এই মা।

সোমবার (১২ অক্টোবর) মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দেন তাসলিমা। ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। তিনি এ মামলার দশম সাক্ষী। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ।

মামলাটিতে সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ মোট ২৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।

৩০ বছর বয়সী তাসলিমা আক্তারের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায়। বর্তমানে তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বসবাস করেন। তাঁর ছেলে ইসমাইল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নিহত হন।

আন্দোলনে গিয়ে আর ফেরেননি ইসমাইল

ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তাসলিমা বলেন, ১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল ৩টার দিকে বাসা থেকে বের হন ইসমাইল। তিনি আল্লাহ করিম মসজিদের পাশে গ্লাস ফ্যাক্টরির সামনে আন্দোলনে যোগ দেন।

তাসলিমার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইসমাইলের বন্ধু মনির তাঁকে ফোন করে জানান, ইসমাইলকে আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে দেখা গেছে। তখন তাঁকে বাসায় ফিরে আসতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ইসমাইল বাসায় না ফিরে আন্দোলনস্থলেই থেকে যান।

পরে ইসমাইলের খালা আকলিমা তাঁকে ফোন করেন। কয়েকবার চেষ্টা করার পর ফোন ধরেন ইসমাইলের বন্ধু কালু। তিনি জানান, ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন তাসলিমা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঢাকা উদ্যান থেকে রিকশায় করে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন।

পথে গুলির ঘটনা দেখার দাবি

তাসলিমা তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, হাসপাতালে যাওয়ার পথে রাস্তায় আগুন জ্বলতে দেখেন। এ সময় কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানক, তাপস ও বিপ্লবের হাতে অস্ত্র ছিল বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর সামনে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে প্রথমে জরুরি বিভাগে ছেলেকে খুঁজতে থাকেন তাসলিমা। সেখানে গুলিবিদ্ধ বহু মানুষকে জীবিত ও মৃত অবস্থায় দেখতে পান। হাসপাতালের বিভিন্ন তলায় খোঁজাখুঁজির পর এক চিকিৎসকের সহায়তা চান তিনি।

তাসলিমা জানান, পরে ওই চিকিৎসক তাঁকে মোবাইল ফোনে একটি ছবি দেখান। ছবি দেখে তিনি ছেলেকে শনাক্ত করেন। ইসমাইল কোথায় আছেন জানতে চাইলে চিকিৎসক তাঁকে মর্গে নিয়ে যান।

পোশাক দেখে ছেলেকে শনাক্ত

মর্গের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তাসলিমা বলেন, সেখানে ৩০০ থেকে ৪০০টি মরদেহ পড়ে ছিল। একটির ওপর আরেকটি মরদেহ থাকায় দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এত মরদেহের ভিড়ে ছেলের মুখ দেখে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত পরনের পোশাক দেখে ইসমাইলকে চিনতে পারেন তিনি। তাঁর ছেলের মাথায় গুলির ক্ষত ছিল।

তাসলিমার অভিযোগ, ছেলের মরদেহ চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে জানায়, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এলে মরদেহ দেওয়া হবে। পরদিন বেলা ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর থানা থেকে সাইফুল দারোগা হাসপাতালে আসেন। এরপর সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইসমাইলের মরদেহ বুঝে পান তিনি।

তাসলিমা আরও অভিযোগ করেন, হাসপাতাল থেকে মামলা করবেন না—এমন বক্তব্য জানিয়ে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। পরে ছাতার মসজিদে ছেলের গোসল ও জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

হত্যার বিচার দাবি মায়ের

জবানবন্দিতে ছেলে ইসমাইলকে হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের দায়ী করেন তাসলিমা। এ ছাড়া তিনি কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, রাসেল, মোল্লা রুবেল, বিপ্লব কুমার, সৈকত, সাজ্জাদ পলাশ, সাত্তার, মোহাম্মদ ইসমাইল, রাষ্ট্রন ও রওশনের নামও উল্লেখ করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ছেলেকে হারানোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তাসলিমা। তিনি ছেলে হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন চার আসামি। তাঁরা হলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক এবং যুবলীগকর্মী ফজলে রাব্বি। মামলার বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *