ট্রাফিক পুলিশ–নামধারী নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় অবৈধ যানবাহন, ফোনকলেই মামলা বাতিল, চট্টগ্রামের সড়কে আইন কার্যত অচল

মোঃ সোহেল:

বন্দর নগরী চট্টগ্রামের মহানগরের সড়কে অবৈধ যানবাহনের দাপট এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, রোড পারমিশন ও বৈধ নম্বর প্লেট ছাড়াই প্রতিদিন শত শত যানবাহনে প্রকাশ্যে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—এসব অবৈধ যানবাহনের একটি বড় অংশের মালিকানা রয়েছে ট্রাফিক পুলিশের সদস্য, কিছু সংবাদকর্মী এবং বিভিন্ন দলের নামধারী নেতাকর্মীদের হাতে—এমন অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে নতুন ব্রিজ থেকে ডিসি মোড়, কোতোয়ালি–বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, কালুরঘাট, অক্সিজেন–আমিন বাজার হয়ে ২ নম্বর গেট পর্যন্ত এলাকায় দেখা যায়—মেক্সিম, টেম্পু, সিএনজি ও পিকআপ ভ্যানে নির্বিঘ্নে যাত্রী তোলা হচ্ছে। অনেক গাড়ির সামনে নম্বর প্লেট থাকলেও পেছনে নেই, আবার একটি নম্বরেই একাধিক গাড়ি চলছে। অধিকাংশ গাড়ির লাইট ব্যবস্থা নষ্ট বা নেই, যার ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।

ধরলেও ছেড়ে দেওয়া হয়একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী অভিযোগ করেন, ট্রাফিক পুলিশ মাঝে মাঝে অবৈধ যানবাহন আটক করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা ছেড়ে দেওয়া হয়।
“গাড়ি ধরার পরই ফোন আসে। পরিচয় জানালে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া হয়,”—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সড়কে আইন নয়—পরিচয় ও প্রভাবই শেষ কথা।

মালিকই যখন প্রভাবশালী
অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ যানবাহনের মালিকদের মধ্যে রয়েছেন ট্রাফিক পুলিশের কিছু সদস্য, কিছু সংবাদকর্মী এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করা নামধারী নেতাকর্মীরা। ফলে এসব গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা বা ব্যবস্থা নিতে গিয়ে নিচু পর্যায়ের ট্রাফিক সদস্যরাও নীরব থাকতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ।

“মাসিক ম্যানেজ”
চালকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, অধিকাংশেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির বৈধ কাগজপত্র নেই। তবুও তারা নির্বিঘ্নে গাড়ি চালাচ্ছেন। চালকদের ভাষ্য,
“আমরা মাসিক টাকা দিই। গাড়ি ম্যানেজ করা থাকে, তাই মামলা হয় না।”

অভিযানের আগেই সতর্কবার্তা
অভিযানের আগেই খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযানের দিন নগরীর বিভিন্ন গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায়, ডকুমেন্টবিহীন গাড়িগুলো সড়কে নামানো হয়নি। চালকরা জানান,“রাতে বলে দেওয়া হয়—আজ গাড়ি বের করা যাবে না।”

যাত্রী হয়রানি ও নীরব প্রশাসন
যাত্রীরা অভিযোগ করেন, এসব যানবাহনে ভাড়ার নামে অতিরিক্ত ১০–১৫ টাকা আদায় করা হয়। প্রতিবাদ করলে দুর্ব্যবহার এমনকি মারমুখী আচরণ করা হয়। ট্রাফিক পুলিশকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না।

প্রশ্ন জননিরাপত্তা নিয়ে
নগরবাসীর প্রশ্ন—যখন অবৈধ যানবাহনের মালিকই হন প্রভাবশালী, তখন সড়কের আইন কার্যকর হবে কীভাবে? প্রশাসনের চোখের সামনে যদি অবৈধ গাড়ি যাত্রী পরিবহন করে এবং ফোনকলেই ছাড়া পায়, তবে জননিরাপত্তা কোথায়?
সচেতন মহলের দাবি—ট্রাফিক বিভাগ, প্রভাবশালী মালিক ও তথ্য ফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া চট্টগ্রামের সড়কে এই ভয়াবহ নৈরাজ্য বন্ধ করা অসম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *