ডেঙ্গুর আতঙ্কে বেড়েছে মশারির চাহিদা, সন্ধ্যা হলেই জ্বলছে কয়েল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় এডিস মশার হাত থেকে বাঁচতে মশারি ও মশা তাড়ানোর বিভিন্ন উপকরণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে নগরবাসীর। ফলে হঠাৎ করেই বেড়েছে মশারির চাহিদা। যেসব দোকানে আগে লুঙ্গি, গামছা কিংবা অন্যান্য কাপড়ের পণ্য বেশি বিক্রি হতো, সেসব দোকানেও এখন দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন আকার ও রঙের মশারি।

শুধু মশারি নয়, ডেঙ্গুর আতঙ্কে বেড়েছে মশার কয়েলের বিক্রিও। রাজধানীর বড় সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার ছোট মুদি দোকান—প্রায় সবখানেই এখন কয়েলের উপস্থিতি চোখে পড়ছে। কোথাও সাজানো হয়েছে কয়েলের স্তূপ, আবার কোথাও মশারির পাশাপাশি রাখা হয়েছে মশা তাড়ানোর নানা সামগ্রী।

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মশারি বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের বোনাফাইড, বোনাফাইড ম্যাজিক, অ্যাঞ্জেল প্লাস, অ্যাঞ্জেল ম্যাজিক, গুড নাইট, প্যারাগন ও সোহান ম্যাজিক উল্লেখযোগ্য। সিঙ্গেল, সেমি-ডাবল ও ডাবল সাইজের পাশাপাশি বিভিন্ন রঙ ও নকশার মশারিও পাওয়া যাচ্ছে।

মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটের ‘নূরানী শাড়ী হাউজ’-এর বিক্রেতা কাউসার পাটওয়ারী জানান, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার কারণে আগের তুলনায় মশারির ক্রেতা বেড়েছে। তবে শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছার বিক্রি আগের মতো নেই।

তিনি জানান, বর্তমানে বাজারে ১৮০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামের মশারি পাওয়া যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের বোনাফাইড মশারির সিঙ্গেল ৩০০, সেমি-ডাবল ৩৫০ ও ডাবল ৪০০ টাকা। বোনাফাইড ম্যাজিক ৪০০ টাকা, অ্যাঞ্জেল প্লাস ১ হাজার ৬০০ টাকা, অ্যাঞ্জেল ম্যাজিক ১ হাজার টাকা, লাক্সারি ৬০০ টাকা, গুড নাইট ৪৫০ টাকা, প্যারাগন ডাবল ৫০০ টাকা এবং সোহান ম্যাজিক ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কাউসার পাটওয়ারী আরও জানান, আগে দিনে দু-একটি মশারি বিক্রি হলেও এখন প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬টি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তার দোকানে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ৬ ফুট বাই ৭ ফুট সাইজের মশারি।

ধানমন্ডির শংকর এলাকা থেকে মশারি কিনতে আসা পারভীন আখতার বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি এক আত্মীয়ের জন্য মশারি কিনতে এসেছেন তিনি। তার অভিযোগ, ছোট একটি মশারির দামও ৩০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। ম্যাজিক মশারি কিনতে কমপক্ষে ৫০০ টাকা লাগছে। অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা বাড়তি দাম নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

‘মায়ের দোয়া বেডিং স্টোর’-এর মালিক আবু দাউদ বলেন, বাজারে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক মশারি এসেছে। বোনাফাইড ম্যাজিক মশারি সহজে ভাঁজ করা যায় এবং এতে সেলফ-স্ট্যান্ড সুবিধা রয়েছে। এসব মশারির দাম ৫৭০ থেকে ৭৫০ টাকা। বোনাফাইড অ্যাঞ্জেল প্লাস মশারির দাম প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। জিপার ও বিভিন্ন প্রিন্টযুক্ত ফোল্ডেবল মশারি ৯০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, শিশুদের জন্য কার্টুন ও বেলুন প্রিন্টের ডোম আকৃতির ছাতা মশারি ১৮০ থেকে ৪৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া বেশি বাতাস চলাচলের উপযোগী ‘উদয় প্রিমিয়াম এয়ারফ্লো’ মশারির দাম ৭৯০ থেকে ১ হাজার ৯০ টাকা পর্যন্ত।

রায়েরবাজারের মশারি বিক্রেতা আমজাদ হোসেন বলেন, সারা বছরই কমবেশি মশারি বিক্রি হয়। তবে গত দুই সপ্তাহে বিক্রি অনেক বেড়েছে। আগে ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করতে হলেও এখন বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, তারা মশারির দাম খুব একটা বাড়াননি এবং ভালো মানের মশারি ৫০০ টাকার মধ্যেই বিক্রি করছেন।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সেলিম মিয়া বলেন, আগে কম দামে সাধারণ মশারি পাওয়া গেলেও এখন তা পাওয়া কঠিন। একটি ম্যাজিক মশারি কিনতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।

একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করা সোহেল মিয়া বলেন, তিনি সারা বছর মশারি টাঙিয়ে ঘুমান। পুরোনো মশারিতে ছোট মশা ঢুকে যাওয়ায় নতুন ডাবল ম্যাজিক মশারি কিনতে এসেছেন। তবে এর দাম ৬৫০ টাকা চাওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

কয়েলের বিক্রিও বেড়েছে

মশারির পাশাপাশি রাজধানীর পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে বেড়েছে মশার কয়েলের বিক্রি। নামিদামি ব্র্যান্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন বেনামি ব্র্যান্ডের কয়েলও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ঈগল, বসুন্ধরা, সোলার, পাতাবাহার, নিমপাতা, এক্সট্রিম, গোদরেজ, বাংলার কিং এবং চায়নিজ কয়েল বাউমা ও ড্রাগন উল্লেখযোগ্য। অধিকাংশ কয়েলের প্যাকেট ৫০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মুদি দোকানদার মাসুম আহমেদ বলেন, প্যাকেটের পাশাপাশি ৫ ও ১০ টাকায় খুচরা কয়েলও বিক্রি করেন তারা। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর কয়েলের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে মাসে এক কার্টন বিক্রি করাই কঠিন ছিল, এখন সপ্তাহে এক কার্টন শেষ হয়ে যাচ্ছে।

তবে কয়েলের ধোঁয়া নিয়ে অভিযোগও রয়েছে ক্রেতাদের। অনেকের দাবি, কয়েল জ্বালানোর পরও মশার উপদ্রব পুরোপুরি কমছে না। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রম কার্যকর না হওয়ায় বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচ করে কয়েল ও মশারি ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে জানান তারা।

কয়েল কিনতে আসা স্কুলশিক্ষিকা লাভলী আখতার বলেন, সন্ধ্যা হলেই কয়েল না জ্বালিয়ে উপায় থাকে না। সিটি করপোরেশন স্প্রে করার পরও কিছুক্ষণ পর আবার মশার উপদ্রব শুরু হয়। ঘরে মশারি ব্যবহারের পাশাপাশি কয়েলও জ্বালাতে হচ্ছে। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতেই এসব ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *