ঢাকাকে এক ছাতার নিচে না আনলে কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসবে না: রাজউক চেয়ারম্যান

মোঃ আনজার শাহ:

নগর সরকারের আদলে ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোরালো গুরুত্বারোপ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম বলেছেন, ঢাকাকে এক ছাতার নিচে না আনা হলে কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসবে না। স্বাধীন সংবাদকে বলেন।

রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, নগর পরিচালনায় সব সিদ্ধান্ত একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ থেকে আসতে হবে। পানি, গ্যাসসহ নগরের সকল সেবা-সংক্রান্ত বিষয়ে এক জায়গা থেকে সমন্বিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে বলেও তিনি মত দেন।

৩ হাজার ৩৮২টি অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান

ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম জানান, ঢাকায় নির্মাণাধীন ৩ হাজার ৩৮২টি ভবনের অবৈধ অংশ চিহ্নিত করে তা ভেঙে ফেলার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অবৈধ নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে পর্যায়ক্রমে ভবনগুলোর অবৈধ অংশ অপসারণ করা হবে। প্রথম ধাপে সেবা-সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ, ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং অনুমোদিত নকশা বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট ভবনগুলো সিলগালা করা হবে।

রাজউক চেয়ারম্যান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, যত দিন আমি দায়িত্বে আছি, এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। ভেঙে হোক কিংবা অন্য যেকোনো উপায়ে হোক — ভবন মালিকদের নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা হবেই। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রথমেই বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নকশার ব্যত্যয় ঘটানো অংশটি চিহ্নিত করে দেওয়া হচ্ছে। ভবন মালিকদের নিজ উদ্যোগে অবৈধ অংশ অপসারণ করে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। অন্যথায় রাজউক নিজেই তা ভেঙে দেবে বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।

আর কোনো প্লট বরাদ্দ নয়, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন

এক প্রশ্নের জবাবে রাজউক চেয়ারম্যান জানান, রাজউক আপাতত আর কোনো নতুন প্লট বরাদ্দ দেবে না। বিদ্যমান জায়গাগুলোতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। আদিবাসী ও সাধারণ ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্লটপ্রাপ্তি সাপেক্ষে এই বিষয়টি ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর মতে, এটি একটি বিশেষ মানবিক প্রক্রিয়া এবং অবশ্যই সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।

ড্যাপ সংশোধনী নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন

ড্যাপ সংশোধনী বিলম্বিত হওয়ায় ভবন নির্মাণ বন্ধ হয়ে গেছে এবং আবাসন ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন — এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান স্পষ্টভাবে বলেন, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। রাজউক কোনো কাজই বন্ধ রাখেনি। নিয়ম মেনে নকশা অনুমোদন এবং ছাড়পত্র প্রদান নিয়মিতভাবে চলছে। তিনি আরও জানান, নকশা অনুযায়ী সরেজমিন পর্যালোচনা করে যতটুকু রাস্তা রয়েছে, সে অনুযায়ীই নির্মাণ অনুমোদন দেওয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে ভবন মালিকদের উদ্দেশে তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, সামান্য মুনাফার আশায় অনিয়মিতভাবে ভবন নির্মাণ করলে তার খেসারত ভবন মালিকদের নিজেদেরই দিতে হবে। রাস্তার জায়গা না ছেড়ে ভবন নির্মাণ করলে দুর্ঘটনার সময় ফায়ার ব্রিগেড প্রবেশ করতে পারবে না। একইভাবে অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে বাধাগ্রস্ত হলে রোগীদের প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যাবে।

ছয় মাসে বাসযোগ্য হবে পূর্বাচল, ঝিলমিলেও আসছে পরিবর্তন

রাজউক চেয়ারম্যান জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে পূর্বাচলকে পূর্ণাঙ্গ বাসযোগ্য এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ঝিলমিল প্রকল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ অধিকাংশ অবকাঠামো ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে। প্লট মালিকদের দ্রুত বাড়ি নির্মাণ শুরু করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা এই নির্দেশনা অমান্য করবেন, তাঁদের প্লট বাতিল কিংবা জরিমানার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে রাজউক বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না বলে তিনি দৃঢ়ভাবে জানান।

অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, দুর্নীতিমুক্ত রাজউক গড়ার অঙ্গীকার

আগস্ট অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অসামান্য অবদানের নামে পূর্বাচল ও ঝিলমিলে বরাদ্দ দেওয়া ৮৩০ জনের প্লট প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান জানান, তাঁদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। তাদের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাজউকে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। অতীতে অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে কেউ অনিয়ম ও দুর্নীতি করে পার পাবে না।

পরিশেষে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ঢাকাকে একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য মহানগরী হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁর প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য। এই মহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি নানামুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *