স্টাফ রিপোর্টার:
সরকারি চাকরিতে বিধি অনুযায়ী পদোন্নতি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তবে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগের পর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে তাঁর পদোন্নতি ও পদায়ন কী প্রক্রিয়ায় হয়েছে—তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কর্মকর্তা মোহাম্মদ জমির হোসেনকে ঘিরে বর্তমানে এমনই প্রশ্ন উঠেছে।
মোহাম্মদ জমির হোসেন আগে বিআরটিএ’র ঢাকা জেলা সার্কেল (ইকুরিয়া)-এ মোটরযান পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিরুদ্ধে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি পদোন্নতি পেয়ে বিআরটিএ’র যশোর সার্কেলের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে যশোর ও সাতক্ষীরা সার্কেলের দায়িত্ব পালনের সময়ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযান ও বিভাগীয় ব্যবস্থা
বিআরটিএ’র বিভিন্ন কার্যালয়কে দালালমুক্ত রাখতে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট একটি স্মারকে বিআরটিএ’র অফিসগুলোতে দালালদের প্রবেশ ও দালালনির্ভর কার্যক্রম বন্ধে নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দালালদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি শৃঙ্খলাজনিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনার কথাও বলা হয়েছে।
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, ঢাকা জেলা সার্কেল (ইকুরিয়া)-এ দায়িত্ব পালনকালে জমির হোসেনের সঙ্গে দালালদের যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসে।
এরপর বিআরটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের সময় পরীক্ষা কেন্দ্রের একটি অফিস কক্ষ থেকে নগদ অর্থসহ কয়েকজন দালালকে আটক এবং তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কারাদণ্ড দেওয়ার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ঘটনায় জমির হোসেনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ মার্চ জমির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং একই সময়ে তাঁকে ঢাকা থেকে বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলির আদেশ দেওয়া হয়।
পদোন্নতি কীভাবে—এ নিয়ে প্রশ্ন
বিভাগীয় ব্যবস্থা ও সাময়িক বরখাস্তের পর পরবর্তী সময়ে জমির হোসেন কীভাবে পদোন্নতি পেলেন, তা নিয়েই এখন মূলত প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে অবস্থানকালে তাঁর পদোন্নতি নিশ্চিত করতে নেপথ্যে তৎপরতা চালানো হয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং পদোন্নতির বিষয়টি প্রভাবিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে আর্থিক লেনদেনের নির্দিষ্ট নথি বা প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো অনৈতিক আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় নথি, পদোন্নতি কমিটির সুপারিশ এবং প্রশাসনিক রেকর্ড পর্যালোচনা প্রয়োজন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও জমির হোসেনের পদোন্নতি ও তাঁকে ঘিরে অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কথা পরবর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে যশোর ও সাতক্ষীরায় দায়িত্ব
পদোন্নতির পর জমির হোসেন বর্তমানে বিআরটিএ’র যশোর সার্কেলের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁকে সাতক্ষীরা সার্কেলের সহকারী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাচ্ছে। সাতক্ষীরার বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠান ও বিআরটিএ-সংক্রান্ত কর্মসূচির প্রতিবেদনে তাঁর উপস্থিতির তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে তাঁর বর্তমান দায়িত্ব পালনের সময়ও যশোর ও সাতক্ষীরা সার্কেলকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস সনদ এবং রুট পারমিটসহ বিভিন্ন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালদের একটি প্রভাবশালী বলয় জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
জমির হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, তাঁর পূর্বের বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং পরবর্তী পদোন্নতির বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিআরটিএ’র একাধিক কর্মকর্তার বক্তব্য ও অভিযোগের কথা এসেছে। তাঁদের কেউ কেউ জমির হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বের বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং পরবর্তী পদোন্নতির বিষয়টি পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
প্রয়োজন নথিভিত্তিক তদন্ত
বিআরটিএ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিটসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করেন। ফলে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দালালনির্ভরতা কিংবা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা জরুরি।
বিশেষ করে জমির হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বে নেওয়া বিভাগীয় ব্যবস্থা, সাময়িক বরখাস্ত, পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি এবং বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সার্কেলে দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনা করার দাবি উঠেছে।