বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৪২ কোটি টাকার গোপন চুক্তির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

দেশের আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) ড. গোলজারে নবীর বিরুদ্ধে। একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভের বিনিময়ে ৪২ কোটি টাকার গোপন আর্থিক চুক্তি সম্পাদনের অভিযোগকে ঘিরে ইতোমধ্যে আর্থিক খাত, নীতিনির্ধারক মহল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত শর্তে এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক সমঝোতা সম্পন্ন হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়ার আগেই ড. গোলজারে নবী একটি গোপন লিখিত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সেই চুক্তিতে আগামী ২৪ মাসের মধ্যে সুদে-আসলে মোট ৪২ কোটি টাকা পরিশোধের অঙ্গীকার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই বিপুল অর্থ আদায়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দুটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ছয়টি স্বাক্ষরিত ব্ল্যাংক চেক সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের কাছে জমা রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি নথি এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে অন্যতম গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হবে। তাদের ভাষ্য, একজন নির্বাহী পরিচালকের বৈধ বেতন, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার সঙ্গে মাত্র ২৪ মাসে ৪২ কোটি টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তবসম্মত সামঞ্জস্য নেই। ফলে এই বিপুল অর্থের উৎস, সম্ভাব্য অর্থায়ন এবং এর পেছনে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি অর্থের বিনিময়ে পদ লাভের মতো অভিযোগ ওঠে, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মের বিষয় নয়; বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। এমন অভিযোগ জনমনে ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থার সংকটও তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা উদঘাটিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা জরুরি। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী পরিচালক ড. গোলজারে নবীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরকারি অবস্থান কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে আর্থিক খাতের বিভিন্ন মহলে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে এবং দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *