বিদ্যুৎ খাতে প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ: দুদকের তদন্তে নতুন মাত্রা

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:

দেশের বিদ্যুৎ খাতকে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এই খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ক্রমাগত সামনে আসছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এসব প্রকল্পের অনেক ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, প্রকল্প অনুমোদন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তব চাহিদা যাচাই না করেই অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে করে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী মহল ঘুষ ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অযোগ্য প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নিচ্ছে। আবার প্রকল্প ব্যয়ের প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এতে করে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।

ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠান ভিন্ন নামে অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতার ভান সৃষ্টি করে।

একজন অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক ক্ষেত্রে টেন্ডার প্রক্রিয়া কাগজে স্বচ্ছ মনে হলেও বাস্তবে পূর্ব নির্ধারিতভাবে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়। এতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াতেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সাবস্টেশন নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের সময় প্রকৃত মালিকদের ক্ষতিপূরণ না দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া মালিকানা দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে।

এছাড়া কিছু এলাকায় প্রভাবশালী চক্র আগেই কম দামে জমি কিনে পরে তা সরকারের কাছে বেশি দামে বিক্রি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এটি একটি পরিকল্পিত অর্থ আত্মসাতের চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে তথাকথিত কাল্পনিক প্রকল্প। অভিযোগ অনুযায়ী কিছু প্রকল্প কাগজে দেখানো হলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ এসব প্রকল্পের নামে বরাদ্দকৃত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

দুদকের প্রাথমিক তদন্তে এমন কিছু প্রকল্পের সন্ধান মিলেছে যেখানে কাজ শুরু না করেই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আংশিক কাজ দেখিয়ে সম্পূর্ণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে অনেক প্রকল্পে কাজ শেষ না হওয়া এবং বারবার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু পরিকল্পনার দুর্বলতা নয় বরং পরিকল্পিত দুর্নীতির অংশ।

নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির অভাবে অনেক প্রকল্প অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পুনরায় সংস্কারের নামে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে, যা জনগণের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

দুদক জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের একাধিক প্রকল্প নিয়ে তদন্ত চলছে। বিভিন্ন নথি জব্দ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর নাম উঠে আসছে বলে জানা গেছে।

এক দুদক কর্মকর্তা বলেন, আমরা প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখছি। কোথায় কীভাবে অনিয়ম হয়েছে তা শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু তদন্ত নয় বরং কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই খাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। একই সঙ্গে দোষীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

বিদ্যুৎ খাতে অনিয়মের কারণে সাধারণ জনগণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, লোডশেডিং এবং ভোল্টেজ সমস্যার কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, উন্নয়নের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও বাস্তবে তার সুফল মিলছে না। বরং বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং সেবার মান নিম্নগামী হচ্ছে।

সরকার বলছে, খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ই-টেন্ডারিং, স্বাধীন অডিট এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হলে এই খাতে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব।

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এখন জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুদকের চলমান তদন্ত ভবিষ্যতে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বাস্তবতা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় চাহিদার সঠিক বিশ্লেষণ ছাড়াই বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যা পরবর্তীতে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি বাড়ে এবং জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

তারা আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাত শুধু একটি অবকাঠামোগত খাত নয় বরং এটি শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এখানে অনিয়ম হলে পুরো অর্থনীতি প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সামাজিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দুর্নীতির সংস্কৃতি বন্ধ না হলে এই খাতে আস্থা ফিরবে না। সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে সেবার মান নিয়ে অসন্তুষ্ট। বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং উচ্চ বিলের কারণে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।

অন্যদিকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি করছেন, প্রতিটি প্রকল্পের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি এবং ঠিকাদার সংক্রান্ত তথ্য সহজে নাগরিকদের জানার সুযোগ থাকলে স্বচ্ছতা বাড়বে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে কিছু প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে কাগজে প্রদর্শিত অগ্রগতির বড় ধরনের অমিল পাওয়া গেছে।

কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ একেবারেই শুরু না হলেও শতভাগ অগ্রগতি দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এটি প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং যোগসাজশের প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার না হলে একই ধরনের সমস্যা পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে। তারা একটি স্বাধীন বিদ্যুৎ খাত মনিটরিং কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছেন।

সরকারি পর্যায়ে ইতোমধ্যে কিছু ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক প্রকল্প এখনও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে।

তারা মনে করেন, পুরো টেন্ডার ব্যবস্থা অনলাইনে সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা গেলে অনেক অনিয়ম কমে আসবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ রিয়েল টাইমে মনিটর করা প্রয়োজন।

জনমত জরিপে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। তারা মনে করেন, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বাড়লেও বাস্তব উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়।

কিছু নাগরিক সংগঠন ইতোমধ্যে আন্দোলন ও গণসচেতনতা কর্মসূচির আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছেন, জনগণের করের টাকা অপচয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই খাতের দুর্নীতি যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তবে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

তাদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রচলিত প্রকল্পগুলোর কঠোর মূল্যায়ন করা জরুরি।

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম এখন একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এই প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তথ্য যাচাই প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *