বিসিআইসির কর্মচারী কাউসারের বিরুদ্ধে মাদক, চুরি ও অনিয়মের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)–এর এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও ব্যবসা, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি, প্রতিষ্ঠানের মালামাল চুরি এবং প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে নিজের অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকেও চুরির ঘটনায় জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় বিসিআইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের প্রশ্রয় থাকার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিসিআইসির এমএলএসএস পদে কর্মরত মো. কাউসার আহমেদ। তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন) মো. দেলোয়ার হোসেনের ব্যক্তিগত পিয়ন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে কাউসার দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম করে আসছেন।

সম্প্রতি বিসিআইসি প্রধান কার্যালয় ও রাজশাহীর স্থানীয় এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে কাউসারের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাজশাহীতে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজশাহীর পবা উপজেলার হড়গ্রাম ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের বাসিন্দা কাউসার আহমেদ কিশোর বয়স থেকেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মাদকাসক্ত কয়েকজন যুবককে নিয়ে এলাকায় একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ওই সময় কাউসার ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই, মারামারি এবং স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ ওঠে। এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় একাধিকবার বিচার-সালিসও হয়েছে বলে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০০৮ সালে স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে কাউসারকে এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে তাঁর বাবা আব্দুল লতিফ তাঁকে ঢাকার সাভারে গার্মেন্টসে চাকরির জন্য পাঠিয়ে দেন।

স্থানীয় প্যানেল চেয়ারম্যান-১ মো. মুনজুর রহমান, ইউপি সদস্য মো. শাজাহান আলীসহ কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।

বিসিআইসিতে চাকরির পরও অভিযোগের ধারাবাহিকতা

২০১০ সালে কাউসার বিসিআইসিতে এমএলএসএস পদে চাকরিতে যোগ দেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের পরও তাঁর বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ অব্যাহত থাকে।

২০১৬ সালে বিসিআইসির নির্বাহী কার্যালয়ে দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন মালামাল চুরির অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে। এর মধ্যে ল্যাপটপ, কাপ-পিরিচ, পেনড্রাইভসহ বিভিন্ন সামগ্রী চুরির অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দাবি করেছেন।

তবে এসব চুরির অভিযোগের বিষয়ে বিসিআইসির কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মিরপুর কলোনিতে মাদকসেবনের অভিযোগ

কাউসারের বিরুদ্ধে বিসিআইসির মিরপুর কলোনিতে মাদকসেবনের পরিবেশ তৈরি করার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর বাসাসহ কলোনির বিভিন্ন স্থানে বহিরাগতদের নিয়ে মাদক সেবন ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

এমনকি মতিঝিলের একটি হোটেলের পেছনে নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষেও নারীসহ মাদক সেবনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কলোনির কয়েকজন বাসিন্দা।

৫২ হাজার টাকা চুরির অভিযোগ, জড়ালো অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে

কাউসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—নিজের ১৫ বছর বয়সী ছেলে জোবায়েরকে দিয়ে চুরি করানোর অভিযোগ।

অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৬ মে ঈদুল আজহার ছুটির সময় বিসিআইসির মিরপুর কলোনির বাসিন্দা মিরাজের বাসা থেকে ৫২ হাজার টাকা চুরির চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় কাউসারের ছেলে জোবায়ের এবং তার এক সহপাঠীকে হাতেনাতে আটক করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় মিরাজ ঢাকা মহানগর পুলিশের শাহআলী থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগের তদন্তে কাউসারের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও সামনে আসে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।

সালিসে জরিমানার অভিযোগ

চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত ৫ জুন বিসিআইসি মিরপুর কলোনির এমপ্লয়ীজ ক্লাবে একটি সালিস বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে। বিসিআইসি কর্মচারী দলের সভাপতি আলমগীর হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মোখলেছুর রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কাউসার ও তাঁর ছেলে জোবায়েরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, সালিসে কাউসার ও তাঁর ছেলে চুরির ঘটনায় নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেন এবং পরে তাঁদের ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত সালিসি সিদ্ধান্ত বা থানার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির আইনগত অবস্থানও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

অফিসে অনুপস্থিত থেকেও অতিরিক্ত ভাতা নেওয়ার অভিযোগ

কাউসারের বিরুদ্ধে অফিসে নিয়মিত উপস্থিত না থাকা এবং দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি অনেক সময় অফিসে অনুপস্থিত থাকলেও অতিরিক্ত কাজের ভাতা বা অধিকাল ভাতা (ওভারটাইম) গ্রহণ করেন।

এ ছাড়া কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিসিআইসির সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি ও উপস্থিতি রেজিস্টার যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়ের অভিযোগ

কাউসারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ থাকার পরও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন—এ প্রশ্নও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিসিআইসির কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রশ্রয়ের কারণেই তিনি প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।

বিশেষ করে তাঁর নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা পরিচালক (পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন) মো. দেলোয়ার হোসেন এবং কর্মচারী প্রধান আ.ন.ম. শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে কাউসারকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

তদন্তের দাবি

বিসিআইসির মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে মাদক, চুরি, অনিয়মিত উপস্থিতি ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে অপরাধে জড়ানোর মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাঁর চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া, কর্মস্থলে উপস্থিতির রেকর্ড, ওভারটাইম ভাতা এবং প্রতিষ্ঠানের মালামাল চুরির অভিযোগও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে কাউসার আহমেদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও কর্মপরিবেশ রক্ষায় অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *