ভুট্টার খোসায় স্বাবলম্বী হচ্ছেন নারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বর্জ্য ভেবে ফেলে দেওয়া ভুট্টার খোসাই এখন রংপুরের মিঠাপুকুরের প্রান্তিক নারীদের আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। সৃজনশীলতা ও উদ্যোগের মাধ্যমে এই কৃষিবর্জ্য ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্প। এতে বদলে যাচ্ছে অনেক নারীর জীবনযাত্রা, সৃষ্টি হচ্ছে স্থানীয় কর্মসংস্থান।ভুট্টার খোসা দিয়ে ফুলদানি, কাপড় রাখার ঝুড়ি, ট্রে, কিচেন বাস্কেট, হ্যান্ডব্যাগ, কলমদানি, ক্যাট বাস্কেট, টব, ফ্রুট বাস্কেট, লন্ড্রি বাস্কেট, সিলিন্ডার বাস্কেট, টেবিল ম্যাট, টিস্যু বক্স ও জুয়েলারি বক্সসহ দুই শতাধিক ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে।সম্প্রতি মিঠাপুকুরের বলদীপুকুর ও আশপাশের এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, বাড়ির কাজের ফাঁকে স্থানীয় নারীরা এসব পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত। কেউ সংসারের খরচ চালাচ্ছেন, আবার কেউ এ আয় দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় মেটাচ্ছেন।দক্ষিণ মমিনপুর এলাকার রিনা মিনজি বলেন, ‘আমরা সাধারণত রাতে এই কাজ করি। দিনের বেলায় স্বামী-সন্তান ও পরিবারের কাজ করি। রাতে অবসরে নিজের ঘরে বসে কাজ করি। এই কাজ থেকে যে টাকা পাই, তা দিয়ে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাই। পাশাপাশি সংসারের খরচও মেটাতে পারি।’একই এলাকার বুল্লি টপ্পো পায়রাবন্দ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘আগে পড়াশোনার খরচের জন্য পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন এই কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই চালাতে পারি। পরিবারের কাছ থেকে আর টাকা নিতে হয় না।’বলদীপুকুর এলাকার হাওয়া বেগম বলেন, ‘আমার সংসারে আমি আর আমার মেয়ে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই কাজ শিখেছি। এখন আমরা নিজেরাই স্বাবলম্বী। এই কাজ করে যে আয় করি, তা দিয়ে সংসারের খরচ চালাই।’শুধু নারীরাই নন, এ উদ্যোগে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে স্থানীয় কৃষকদেরও। আগে ভুট্টা তোলার পর খোসা ফেলে দিতেন তারা। এখন সেই খোসা বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করছেন।উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান নিউট্রিসাইকেল বায়োসোলিউশনের উদ্যোক্তা শিরিন আক্তার শিলা বলেন, ফেলে দেওয়া ভুট্টার খোসাকে সম্পদে পরিণত করার ভাবনা থেকেই এ উদ্যোগের শুরু। কৃষিবর্জ্য ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। শুরুতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতায় উদ্যোগটির যাত্রা শুরু হয়। ধীরে ধীরে উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে পণ্য তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।আরেক উদ্যোক্তা নূর ইসলাম নাইম বলেন, ‘প্রতিদিন মানুষ একটি ক্রেডিট কার্ডের সমপরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক খেয়ে থাকে। তাই পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির ভাবনা থেকেই এই উদ্যোগ।’উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে এ উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এতে কৃষিবর্জ্যের পরিমাণ কমার পাশাপাশি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।তাদের মতে, ভুট্টার খোসা থেকে তৈরি এসব পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাজারে চাহিদাও বাড়ছে। সঠিক প্রশিক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে এ উদ্যোগ গ্রামীণ নারীদের আরও স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি কৃষিবর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো কাজ। উদ্যোক্তাদের জন্য সবসময় সহযোগিতা থাকবে। উদ্যোক্তাদের কাজ পরিদর্শন করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *