স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল:
বরিশালের রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাইশা নামের এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্ন যেন থামছেই না। মৃত্যুর কারণ, চিকিৎসার ধরন ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের ভূমিকা নিয়ে স্বজনদের অভিযোগের পাশাপাশি এবার সামনে এসেছে ডা. তহুরা আক্তারের অবস্থান এবং তার কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন। স্বজনদের অভিযোগ, মাইশার মৃত্যুর পর ডা. তহুরাকে তারা নিয়মিতভাবে সামনে পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে বরিশালের ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি)-তেও তার অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তবে তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন, কর্মস্থলে অনুপস্থিতির কারণ কী—এসব বিষয়ে ডা. তহুরার বক্তব্য এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও নথিপত্র যাচাই জরুরি।
ডা. তহুরার কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় এবং অর্থ লেনদেনের পদ্ধতি নিয়েও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন রোগীর স্বজন। তাদের অভিযোগ, সিজারিয়ানসহ বিভিন্ন চিকিৎসা-সংক্রান্ত আর্থিক বিষয়ে রোগীর স্বজনদের অনেক সময় ডা. তহুরার স্বামী বাবলুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। কয়েকজন স্বজনের দাবি, অন্যান্য চিকিৎসকের ক্ষেত্রে যেখানে সিজারিয়ান ডেলিভারির ব্যয় তুলনামূলক কম বলে জানানো হয়, সেখানে ডা. তহুরার কাছে চিকিৎসা নিতে ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—অভিযোগ করা অর্থের প্রকৃত পরিমাণ কত, এর মধ্যে চিকিৎসা ও হাসপাতাল ব্যয় কত এবং ব্যক্তিগতভাবে কোনো অর্থ লেনদেন হয়ে থাকলে তার প্রকৃতি কী? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন চিকিৎসা বিল, হাসপাতালের নির্ধারিত মূল্যতালিকা, রসিদ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, চিকিৎসার খরচ সম্পর্কে সরাসরি ডা. তহুরার কাছে জানতে চাইলে অনেক সময় তার স্বামী বাবলুর সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়। এতে রোগীর স্বজনদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, হাসপাতাল ব্যয় এবং রোগীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কার কী দায়িত্ব রয়েছে? তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বক্তব্য জানা প্রয়োজন। ডা. তহুরার কাছে অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকার কারণে তাড়াহুড়ো করে চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার করার ফলে কিছু রোগী পরবর্তী সময়ে জটিলতায় পড়েছেন—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন স্বজন। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট রোগীদের চিকিৎসা নথি, অপারেশন রেকর্ড, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র এবং পরবর্তী চিকিৎসার তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো—রোগীর সংখ্যা, চিকিৎসার সময়, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা এবং পরবর্তী জটিলতার মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা কি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে?
একই ফ্লোরে হাম আক্রান্ত ও সাধারণ শিশু?
রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
মাইশার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই রাহাত আনোয়ার হাসপাতালের শিশুদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও অভিযোগ সামনে এসেছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাম আক্রান্ত শিশু এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের কাছাকাছি বা একই ফ্লোরের এলাকায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ শিশু ও নবজাতকদের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিজারিয়ান ডেলিভারির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া নবজাতক, সর্দি-কাশি কিংবা অন্যান্য সাধারণ অসুস্থতা নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের একই ভবনের শিশু ওয়ার্ড বা কেবিন এলাকায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। একই সময়ে হাম আক্রান্ত শিশুদেরও কাছাকাছি এলাকায় চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিছু স্বজনের দাবি, সাধারণ অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার কয়েকদিন পর কোনো কোনো শিশুর মধ্যে হাম-সদৃশ উপসর্গ দেখা গেছে। তবে কোনো শিশুর হাম হাসপাতাল থেকেই সংক্রমিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই। এ ধরনের অভিযোগ নিশ্চিত করতে চিকিৎসা পরীক্ষা, রোগীর ইতিহাস এবং সংক্রমণ অনুসন্ধান প্রয়োজন। তবে অভিযোগটি সামনে আসায় হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীকে অন্য রোগীদের থেকে পৃথক রাখা এবং প্রয়োজনীয় সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য পৃথক আইসোলেশন ব্যবস্থা আছে কি? সাধারণ শিশু ও নবজাতকদের থেকে তাদের কীভাবে পৃথক রাখা হচ্ছে? একই চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী উভয় ধরনের রোগীর সেবা দিলে সংক্রমণ প্রতিরোধে কী প্রটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে? হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কমিটি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়মিতভাবে এসব ব্যবস্থা তদারকি করেন কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই পাওয়া প্রয়োজন। মাইশার মৃত্যুর ঘটনা, ডা. তহুরার অবস্থান ও কর্মস্থলে উপস্থিতি, চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে অভিযোগ এবং শিশুদের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু মিলিয়ে রাহাত আনোয়ার হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। স্বজনদের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগেভাগে দায়ী না করে প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের সত্যতা না থাকলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হোক। কারণ চিকিৎসাসেবায় আস্থা তৈরি হয় শুধু চিকিৎসা দেওয়ার মাধ্যমে নয়—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেও। তালাশ বিডির অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। এরপর—রাহাত আনোয়ার হাসপাতালের অন্দরমহলের আরও কিছু অভিযোগ, নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিয়ে আসছে পরবর্তী পর্ব।