মাদকমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গড়তে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই: ডিসি রায়হান কবির

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:

মাদক, কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোঃ রায়হান কবির। তিনি বলেন, “মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।”

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা কলেজ রোড এলাকায় মাদক নির্মূল ও কিশোর অপরাধ দমন বিষয়ক সচেতনতামূলক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. সাখাওয়াত হোসেন খান। এছাড়াও অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, আয়োজক কমিটির সদস্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

সভায় জেলা প্রশাসক মোঃ রায়হান কবির বলেন, বর্তমান সময়ে মাদকাসক্তি এবং কিশোর অপরাধ সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুটি সমস্যা শুধু ব্যক্তি বা একটি পরিবারকে নয়, বরং পুরো সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পরিবারকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের সন্তানদের শুধু ভালো শিক্ষার্থী নয়, ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের চর্চা বাড়াতে পারলে তারা সহজে মাদক বা অপরাধের পথে পা বাড়াবে না। এজন্য অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনকে একযোগে কাজ করতে হবে।”

জেলা প্রশাসক বলেন, সরকারের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে মাদকবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে হবে। কোনো এলাকায় মাদক ব্যবসা বা কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দেখা গেলে তা গোপন না রেখে দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, মাদক ও কিশোর অপরাধ দমনে জেলা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। তিনি অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়ার আহ্বান জানান এবং তাদের চলাফেরা, বন্ধু নির্বাচন ও অনলাইন কার্যক্রমের প্রতি নজর রাখার পরামর্শ দেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, একটি সুস্থ সমাজ গঠনে তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সৃজনশীল কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার বিকল্প নেই। সমাজের প্রতিটি ওয়ার্ড ও মহল্লায় মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সভায় উপস্থিত বক্তারা বলেন, মাদক ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে স্থানীয় জনগণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকেও একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

বক্তারা আরও বলেন, মাদকাসক্তি একটি ব্যক্তি নয়, বরং পুরো পরিবারের জন্য অভিশাপ। তাই সমাজের প্রতিটি মানুষকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আলোচনা শেষে মাদক, কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। একই সঙ্গে সচেতনতা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *