হাসান আলি:
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে মোহাম্মদ রাজু এক শক্তিশালী ও মানবিক বার্তা দিয়ে চলেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি স্পষ্ট ভাষায় তার অধীনস্থ অফিসারদের জানিয়ে দিয়েছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কোনো ধরনের অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করা হবে না এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে তার প্রধান অঙ্গীকার। তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই তিনি দিয়ে চলেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দুটি প্রোগ্রাম—একটি হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন, আরেকটি হচ্ছে ঈদ—এই দুটি পরীক্ষায় অত্যন্ত ধৈর্য এবং সাহসিকতার সঙ্গে মানুষকে স্বস্তির নিঃশ্বাস দিয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়। তার মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটনের ভেতরে সবচেয়ে বড় থানা হচ্ছে যাত্রাবাড়ী থানা, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্রাইমপ্রবণ এলাকা। নির্বাচনকালীন সময়ে এই এলাকাগুলোতে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, খুনাখুনি, ভোটকেন্দ্র দখলের মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। কিন্তু যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু তা শক্ত হাতে মোকাবিলা করেছেন এবং একপ্রকার শান্তভাবেই নির্বাচনকালীন দুর্ঘটনাগুলো রোধ করেছেন। তার নেতৃত্বে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে যাত্রাবাড়ীর নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, যা একজন বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফল।
নির্বাচন শেষ হওয়ার পর মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরের সময় যাত্রাবাড়ীতে ডাকাতি, ছিনতাই অনেক বেড়ে যায়। কারণ বাংলাদেশের প্রায় ছয়টি বিভাগের প্রবেশ ও বের হওয়ার স্থান এই যাত্রাবাড়ী এলাকা। ঈদকালে লাখ লাখ মানুষ বাড়িতে গেছে এবং ঈদ শেষে আবার ঢাকায় প্রবেশ করেছে নির্ভয়ে। সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ড ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই মানুষ অবাধে যাতায়াত করতে পেরেছে ওসি রাজুর নেতৃত্বে।
বুধবার (ডিসেম্বর ২০২৬ ইং) আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এক বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমি এই দায়িত্বকে শুধু একটি পদ হিসেবে দেখি না, এটি আমার কাছে জনগণের নিরাপত্তা রক্ষার একটি অঙ্গীকার। পুলিশের পোশাক গায়ে তোলার অর্থই হচ্ছে মানুষের পাশে থাকা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। যত চাপই আসুক, যত বাধাই আসুক—আমি কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করবো না।”
উচ্চশিক্ষিত এই কর্মকর্তা আরও বলেন, “যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় মাদক, সন্ত্রাস, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং কিংবা যেকোনো অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। মানুষ কেন অপরাধ করে, তার ওপর আমার ডিগ্রি নেওয়া হয়েছে। অপরাধী যেই হোক, তার কোনো ছাড় নেই। আইনের আওতায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জনগণই পুলিশের শক্তি, সবার সহযোগিতা চাইলেন
ওসি রাজু তার বক্তব্যে বিশেষভাবে সাধারণ মানুষের সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়, এটি একটি যৌথ দায়িত্ব। সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যদি আমাদের পাশে থাকেন, তাহলে আমরা খুব দ্রুত একটি নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবো। আমি সবার সহযোগিতা কামনা করছি।”
আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে গত চার মাসে প্রায় ৩০০/৪০০ ছিনতাইকারীকে ধরা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যাত্রাবাড়ী যেহেতু ছিনতাইপ্রবণ এলাকা, সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করছি ছিনতাইমুক্ত রাখার।
মেট্রোপলিটন পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করে অর্জিত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি এর আগে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং জায়গায় কাজ করেছি। প্রতিটি জায়গায় একটি বিষয় বুঝেছি—সততা, সাহস এবং জনগণের আস্থা থাকলে কোনো অপরাধই দমন করা অসম্ভব নয়। সেই অভিজ্ঞতা দিয়েই আমি যাত্রাবাড়ী থানায় কাজ করছি।”
দায়িত্ব গ্রহণের পরই দৃশ্যমান তৎপরতা শুরু হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযান, সন্দেহভাজন অপরাধীদের ওপর নজরদারি এবং নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে কিছু কার্যক্রম শুরু করেছি। খুব শিগগিরই আপনারা এর ইতিবাচক ফল দেখতে পাবেন। আমার লক্ষ্য একটাই—মানুষ যেন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, শান্তিতে বসবাস করতে পারে।”
কঠোরতা ও মানবিকতার সমন্বয়
পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়, এটি মানুষের আস্থার জায়গা। আমরা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হবো, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতি থাকবো সহানুভূতিশীল। কেউ যদি ন্যায়বিচার পেতে থানায় আসে, তাকে যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হতে হয়—সেটা নিশ্চিত করবো।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, খুব শিগগিরই বদলে যাবে
ওসির এমন দৃঢ় ও সুস্পষ্ট বক্তব্যে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যে অপরাধচক্রগুলো এলাকায় সক্রিয় ছিল, সেগুলো দমনে এবার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “ওসি সাহেব যেভাবে কথা বলেছেন এবং কাজ শুরু করেছেন, তাতে আমরা আশাবাদী—যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”
মোঃ রাজুর কণ্ঠে যে দৃঢ়তা, কথায় যে প্রতিশ্রুতি—এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষা। তবে শুরুতেই তার ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থান ইতোমধ্যেই একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কোনো ছাড় নেই, অপরাধীদের জন্য যাত্রাবাড়ী থানা আর নিরাপদ নয়।