নারায়ণগঞ্জে শিশুশ্রম নিরসনে জোরালো উদ্যোগ: নিয়মিত অভিযান ও মনিটরিংয়ের ঘোষণা ডিসি রায়হান কবিরের

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:

শিশুশ্রম নির্মূল এবং শিশুদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় নতুন করে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে “শিশুশ্রম নিরসনে করণীয়” শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.) সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সেমিনারে সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি, শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, এনজিও কর্মী, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোঃ রায়হান কবির। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ।

সেমিনারে বক্তারা শিশুশ্রমের বর্তমান পরিস্থিতি, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এবং নির্মূলে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তারা বলেন, শিল্প-কারখানা, হোটেল, ওয়ার্কশপ এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ খাতে শিশুদের নিয়োগ এখনও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এসব ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, দরিদ্রতা, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবকে শিশুশ্রম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোঃ রায়হান কবির শিশুশ্রমকে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে বলেন,
“একটি শিশু যখন বই-খাতা ছেড়ে শ্রমে যুক্ত হয়, তখন শুধু একটি শিশুই নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশুশ্রম বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।”

তিনি আরও বলেন,
“নারায়ণগঞ্জ একটি বৃহৎ শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে শিশুশ্রমের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তাই জেলা প্রশাসন কল-কারখানা মালিক, শ্রমিক সংগঠন, এনজিও এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে। প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা আমাদের অগ্রাধিকার। এ জন্য নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা এবং কঠোর মনিটরিং অব্যাহত থাকবে।”

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপসচিব মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ বলেন,
“সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম ২০২৫ সালের মধ্যে এবং সকল ধরনের শিশুশ্রম ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মূলের লক্ষ্যে কাজ করছে। জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০ এবং শ্রম আইন-২০০৬ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন,
“শুধু আইন প্রয়োগ বা অভিযান চালিয়ে শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর পেছনে দারিদ্র্য বড় ভূমিকা রাখে। তাই দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি মালিকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা শিশুশ্রম থেকে বিরত থাকেন।”

সেমিনারে নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. এএফএম মশিউর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ ইব্রাহিমসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও শ্রম অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরাও অংশ নেন।

বক্তারা সম্মিলিতভাবে মত দেন যে, শিশুশ্রম নির্মূলে সরকার, প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। তারা শিশুদের জন্য নিরাপদ শৈশব, মানসম্মত শিক্ষা এবং সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা দেশের অন্যান্য জেলাগুলোর জন্য একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে এবং শিশুশ্রম নির্মূলে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *