তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সঙ্গে আঁতাতে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এক এসআইয়ের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

আবু মোহাম্মদ মঈনুল আহসান:

ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় শুরু হওয়া একটি পারিবারিক বিরোধ কীভাবে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় গিয়ে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জোরপূর্বক সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায়ের অভিযোগে রূপ নিয়েছে—তা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে গভীর প্রশ্ন। ভুক্তভোগী মো. আলী মিয়ার অভিযোগ, তার তালাকপ্রাপ্তা সাবেক স্ত্রী রুবিনা আক্তার এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই বজলুর রহমানের যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে তাকে ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে।

এ ঘটনায় তিনি নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পুলিশের সিকিউরিটি সেলের এআইজি এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারের কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন, যা এখন উচ্চপর্যায়ে নজর কাড়ছে।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালের মে মাসে ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক রুবিনা আক্তারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য কলহের জেরে ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর কাজীর মাধ্যমে তালাক সম্পন্ন হয়। তালাকের পর সাবেক স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হলে ২০২৩ সালের ১১ জুন যাত্রাবাড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৯৬৫) করেন তিনি।

পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং দেনমোহরের দুই লাখ টাকা পরিশোধের মাধ্যমে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত মীমাংসা সম্পন্ন হয়। এতে করে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল।

তবে অভিযোগকারী দাবি করেন, ওই সমঝোতার পরও বিরোধের অবসান হয়নি; বরং নতুন করে পরিকল্পিতভাবে চাপ সৃষ্টি শুরু হয়। যাত্রাবাড়ী থানাধীন ধোলাইপাড় এলাকার বাসিন্দা রুবিনা আক্তার সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় কর্মরত পরিচিত এসআই বজলুর রহমানের সঙ্গে আঁতাত করে তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেন।

মো. আলী মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে দক্ষিণ সায়েদাবাদে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে কৌশলে তাকে বের করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে ভয় দেখিয়ে চার লাখ টাকা দাবি করা হয়।

তিনি বলেন, “আমাকে এমনভাবে ভয় দেখানো হয় যে, টাকা না দিলে রাজনৈতিক, মাদক, অস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে দিয়ে জেলে পাঠানো হবে।” এই আতঙ্কে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হই। পরে আরও টাকা আদায়ের জন্য আমার কাছ থেকে তিনটি ১০০ টাকার সাদা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, পরবর্তীতে ধাপে ধাপে আরও ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও ওই স্ট্যাম্প ফেরত দেওয়া হয়নি। বরং সেই সাদা স্ট্যাম্পকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আবারও দুই লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাকে বিভিন্ন ধরনের মামলায় জড়িয়ে দিয়ে জেল খাটানোর হুমকিও অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ঘটনাটি একদিনের নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে তাকে চাপে রাখা হচ্ছে। তিনি জানান, অভিযুক্ত এসআই ও তার সাবেক স্ত্রী একাধিকবার তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রকাশ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন, কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালিগালাজ এবং টাকা আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছেন। এতে তিনি ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো—যাত্রাবাড়ীর একটি বিরোধ কীভাবে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার আওতায় এলো? কোন আইনি ভিত্তিতে একজন পুলিশ কর্মকর্তা ভিন্ন এলাকার একজন ব্যক্তিকে থানায় নিয়ে গিয়ে অর্থ আদায় ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিতে পারেন?

আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো অপরাধের তদন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকার থানার এখতিয়ারের মধ্যে হওয়া উচিত। ভিন্ন জেলার কোনো পুলিশ সদস্য সরাসরি হস্তক্ষেপ করলে তা নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও অনুমোদনের মাধ্যমে হতে হয়। অন্যথায় তা ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এছাড়া ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়, জোরপূর্বক স্বাক্ষর গ্রহণ এবং মিথ্যা মামলার হুমকি—এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা ফৌজদারি আইনে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে মো. আলী মিয়া সংশ্লিষ্ট তিন দপ্তরের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, তার কাছ থেকে নেওয়া সাদা স্ট্যাম্প উদ্ধার এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে এসআই বজলুর রহমান ও রুবিনা আক্তারের বক্তব্য জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *