রাজউকের দুই মোবাইল কোর্টের একযোগে অভিযানে মতিঝিল থেকে ধানমন্ডি — অবৈধ নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে এবার নেই কোনো আপোস

মোঃ আনজার শাহ:

যে শহরে প্রতিটি ইট গেঁথে ওঠে স্বপ্নের সঙ্গে, সেই শহরেই আজ বেজে উঠল আইনের দামামা। রাজধানীর বুকে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অবৈধ নির্মাণ, অননুমোদিত স্থাপনা ও ইমারত বিধিমালার নির্লজ্জ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আজ বুধবার কঠোর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ — রাজউক।

আজ সকালে মতিঝিলের ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র এবং এলিফ্যান্ট রোড, কারওয়ান বাজার, ধানমন্ডি ও লালমাটিয়াসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় একযোগে দুটি শক্তিশালী মোবাইল কোর্ট মাঠে নামে। এই অভিযান কেবল একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম নয় — এটি রাজধানীর লাখো বাসিন্দার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের প্রতি রাজউকের দৃঢ় দায়বদ্ধতার প্রকাশ।

প্রথম অভিযান: মতিঝিলে ভোরের আলোয় আইনের জাগরণ

সাবজোন-৬/১-এর আওতায় আজ ভোরের আলো ফোটার পরপরই সকাল ঠিক ৯টায় মতিঝিল মৌজায় প্রথম মোবাইল কোর্ট তার কার্যক্রম শুরু করে। রাজধানীর এই বাণিজ্যিক হৃদয়ে দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা অবৈধ স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে আজ যেন জেগে উঠল প্রশাসনের বিবেক।

অভিযানে বলিষ্ঠ ও সাহসী নেতৃত্ব দেন বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জনাব শাহনাজ পারভীন বিথী। আইনের প্রতি অটল আস্থা ও অদম্য মনোবল নিয়ে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে সার্বিক সমন্বয় ও অথরাইজড অফিসারের গুরুদায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেন সাবজোন-৬/১-এর জনাব আব্দুল্লাহ আল মামুন।

মাঠের উত্তাপে নিজেদের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার প্রমাণ রেখে সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে কাজ করেন তন্ময় দেবনাথ ও মো. মেহেদী হাসান। নির্মাণ কাঠামোর গভীরে তদন্তের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন প্রধান ইমারত পরিদর্শক মো. সেলিম বকাউল ও মো. ফজলুল হক। সার্বিক পরিদর্শন কার্যক্রমে সহায়তা করেন ইমারত পরিদর্শক ডেভিড চাকমা ও মো. সাইফুল ইসলাম।

দ্বিতীয় অভিযান: ধানমন্ডি-কারওয়ান বাজারে মধ্যসকালের বজ্রপাত

একই দিনে, একই প্রতিজ্ঞায় সকাল ১০টায় সাবজোন-৫/২-এর অধীনে দ্বিতীয় মোবাইল কোর্ট সমান শক্তি ও দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মাঠে নামে। এলিফ্যান্ট রোড, কারওয়ান বাজার, ধানমন্ডি ও লালমাটিয়াসহ সাবজোন-৫/২-এর সমগ্র এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই অভিযানের তরঙ্গ। বহুল আলোচিত এই এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আজ যেন উঠে এল এক নতুন ভোর।

অভিযানের সম্মুখভাগে থেকে সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দেন বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জনাব মো. সবুজ হাসান। সামগ্রিক আইনি কার্যক্রম সুশৃঙ্খল ও কার্যকরভাবে পরিচালনায় অথরাইজড অফিসার হিসেবে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেন জনাব মো. রকিবুল হাসান।

মাঠ পর্যায়ে অক্লান্ত পরিশ্রম ও দায়িত্বনিষ্ঠার সঙ্গে সহকারী অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন জনাব কাওছার আহমেদ ও জনাব আব্দুল্লাহ আল নোমান। ইমারত পরিদর্শনে বিশেষ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে প্রধান ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেন জনাব আবু শামস রাকিব উদ্দিন ও জনাব সজল মজুমদার। এ ছাড়া ইমারত পরিদর্শক মো. তৌহিদ হাসান অনুপস্থিত কর্মকর্তা মো. এনামুল হকের স্থলে পূর্ণ দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে অভিযানে অংশগ্রহণ করেন।

ঢাকাকে বাঁচানোর লড়াই: পেছনের গল্প

রাজধানী ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরী। প্রতিদিন এই শহরের বুকে গড়ে উঠছে নতুন নতুন স্থাপনা। কিন্তু সেই নির্মাণের একটি বড় অংশ হচ্ছে বিধিবহির্ভূত, অননুমোদিত এবং সরাসরি বিপজ্জনক। অতীতের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিসহ একাধিক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে — অবৈধ নির্মাণের মাশুল কতটা ভয়াবহ, কতটা মর্মান্তিক হতে পারে।

এই বেদনাদায়ক বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাজউকের আজকের এই দ্বিমুখী অভিযান একটি সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের নিয়মিত, কঠোর ও দৃশ্যমান অভিযান কেবল অবৈধ নির্মাণকারীদের নিরুৎসাহিত করবে না — বরং আইন মেনে চলার একটি সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও সহায়তা করবে।

রাজউকের অঙ্গীকার: থামবে না এই অভিযান

রাজউক সূত্র দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছে — আজকের অভিযান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। রাজধানীর প্রতিটি জোন ও সাবজোনে পর্যায়ক্রমে এই মোবাইল কোর্ট অভিযান অব্যাহত থাকবে। অবৈধ নির্মাণ, ইমারত বিধিমালা লঙ্ঘন ও অননুমোদিত স্থাপনার বিরুদ্ধে রাজউকের জিরো টলারেন্স নীতি থেকে পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই।

পরিকল্পিত, নিরাপদ ও মানবিক একটি রাজধানী গড়ে তোলার এই মহৎ সংগ্রামে রাজউক সর্বদা নগরবাসীর পাশে থাকবে। একই সঙ্গে প্রতিটি নাগরিককেও আইন মেনে চলার এবং অবৈধ নির্মাণের বিষয়ে রাজউককে অবহিত করার আন্তরিক আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

“ঢাকাকে বাঁচাতে হলে আজই জাগতে হবে — রাজউক জেগেছে, এবার জাগুক নগরবাসীও।”

তথ্যসূত্র: মো. জোবায়দুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ ও প্রটোকল), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *