আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
উন্নত জীবনের স্বপ্ন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশা আর দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা—এসব স্বপ্ন বুকে নিয়েই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন ৬০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। কিন্তু সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে বিভীষিকায়। লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে একটি নৌকাডুবির ঘটনায় তাদের মধ্যে অন্তত ৫০ জন নিখোঁজ হয়েছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে তাদের অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন।
পূর্ব লিবিয়ার কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে উপকূলীয় শহর তোব্রুক থেকে ইতালির উদ্দেশে একটি ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকায় করে যাত্রা শুরু করেন ৬০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। যাত্রার কিছুক্ষণের মধ্যেই অজ্ঞাত কারণে নৌকাটি ডুবে যায়। মুহূর্তেই সাগরে ছড়িয়ে পড়েন যাত্রীরা। তীব্র স্রোত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অধিকাংশই ভেসে যান।
এ দুর্ঘটনায় মাত্র ১০ জন যাত্রী সাঁতরে নিকটবর্তী বারদা দ্বীপে পৌঁছাতে সক্ষম হন। পরে সেখান থেকে তাদের জীবিত উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। নিখোঁজদের খোঁজে কোস্ট গার্ডের উদ্ধার অভিযান চললেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় হাজারো মানুষ লিবিয়ার উপকূলকে যাত্রার সূচনা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বেকারত্বের কারণে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার বহু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই বিপজ্জনক সমুদ্রপথে পা বাড়ান। কিন্তু মানবপাচারকারী চক্রের ব্যবহৃত জরাজীর্ণ ও অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকাগুলো প্রায়ই ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভূমধ্যসাগর বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনপথে পরিণত হয়েছে। উন্নত জীবনের আশায় যাত্রা শুরু করলেও অনেকের ভাগ্যে জোটে মৃত্যু, নিখোঁজ হওয়া কিংবা মানবপাচারকারীদের নির্যাতন। প্রতিবার এমন দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হলেও মানবপাচার বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লিবিয়ার উপকূলে এটি প্রথম বড় দুর্ঘটনা নয়। গত মাসেও একই ধরনের আরেকটি নৌকাডুবিতে অন্তত ৫১ জন নিখোঁজ হন। একের পর এক দুর্ঘটনা প্রমাণ করছে, ভূমধ্যসাগরের এই রুট এখনো অত্যন্ত প্রাণঘাতী।
জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ মে পর্যন্ত লিবিয়ার উপকূলে ৮০০-র বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক। ইউরোপে নতুন জীবনের আশায় তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নিয়েছিলেন।
নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজদের পরিচয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন দেশের অসংখ্য পরিবার চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্বজনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে—সেই অনিশ্চয়তা তাদের জন্য আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে। উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো নিখোঁজদের সন্ধান অব্যাহত রাখলেও অনেক ক্ষেত্রেই এমন দুর্ঘটনায় দীর্ঘদিন পরও বহু মানুষের কোনো খোঁজ মেলে না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, কেবল উদ্ধার অভিযান জোরদার করলেই হবে না; মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ, নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সংঘাত ও দারিদ্র্য মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় ভূমধ্যসাগর আরও বহু স্বপ্নবাজ মানুষের শেষ গন্তব্য হয়ে থাকবে।
সূত্র: এএফপি, ফার্স্টপোস্ট