নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেছেন, বিষয়টি একটি আইনগত ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে এবং এর সঙ্গে আদালতও সম্পৃক্ত। ফলে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর একটি অধিবেশনে প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এরই মধ্যে ভারতের অবস্থান একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন। বিষয়টি নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া চলমান। একই কারণে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয়।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের ফেরত দেওয়ার বিষয়েও একই ধরনের আইনগত প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেন ভারতের হাইকমিশনার।
শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতে গিয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, তাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি। বাংলাদেশে সে সময় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি ভারতে এসেছিলেন।
তিনি বলেন, ওই সময় একটি সামরিক বিমান ভারতে এসেছিল এবং ভারতও এমন পরিস্থিতির জন্য আগে থেকে প্রস্তুত ছিল না। তখন বিভিন্ন মাধ্যমে শেখ হাসিনা অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন বলে খবর প্রচার হচ্ছিল। সেই সময় তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরিস্থিতির বাস্তবতায় ভারতের সামনে খুব বেশি বিকল্পও ছিল না।
দীনেশ ত্রিবেদীর ভাষ্য, একজন প্রতিবেশী হিসেবে সে সময়কার বাস্তবতা গ্রহণ করাই ভারতের দায়িত্ব ছিল। কোনো দেশই সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য আগে থেকে প্রস্তুত থাকে না। ভারত যদি তখন তাকে গ্রহণ না করত বা অবতরণের অনুমতি না দিত, তাহলে পরিস্থিতি আরও কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তা বলা কঠিন।
তিনি বলেন, এটি ছিল সেই সময়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা। আর বর্তমান সময়ে যে আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে, সেটি নিজস্ব গতিতে চলছে। বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে নিজেদের আইনগত প্রক্রিয়াকে সম্মান করে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে যা বললেন ত্রিবেদী
বাংলাদেশের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভালো বোঝে। তাই বাংলাদেশের কী করা উচিত, তা অন্য কারও বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের প্রশ্নও আসে না। বাংলাদেশের জনগণের ওপর ভারতের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের সঙ্গে যে ধরনের সম্পর্কই বজায় রাখুক না কেন, নিজেদের জনগণের স্বার্থ রক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে। একইভাবে ভারতেরও নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অধিকার রয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্ককে শুধু লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এর সঙ্গে দুই দেশের গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক জড়িত।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলের মানুষ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তিনি ভালোভাবে বোঝেন। দুই দেশের এই বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী ও মৌলিক।
রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলগীতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের গভীরতা বাইরের বিশ্বের পক্ষে পুরোপুরি বোঝা কঠিন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা—এটিও দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, একটি পরিবারের মধ্যেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। গণতন্ত্রেও মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে এসব সমস্যা সমাধানের পথ হলো সংলাপ, আলোচনা, পরামর্শ ও পারস্পরিক যোগাযোগ। আর এর ভিত্তি হলো আস্থা।
তিনি বলেন, দূরত্ব রেখে কোনো সম্পর্কের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি চলমান প্রক্রিয়া। দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা ও আন্তরিকতা রয়েছে এবং এ কারণে সম্পর্কের মূল ভিত্তি অটুট রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।