লাইফস্টাইল ডেস্ক:
জীবনে প্রতিদিনই নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ব্যক্তিগত জীবন থেকে কর্মক্ষেত্র—ছোট-বড় বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অনেকেরই মানসিকভাবে ক্লান্ত লাগতে পারে। অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে তৈরি হওয়া এই মানসিক অবস্থাকে বলা হয় ডিসিশন ফ্যাটিগ বা সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি।
সারাদিনে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিতে হলে মনোযোগ ধরে রাখা ও স্থিরভাবে চিন্তা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনেও পড়তে পারে।
সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তির লক্ষণ
ডিসিশন ফ্যাটিগের কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ হলো—সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধায় পড়া, সিদ্ধান্ত নিতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় নেওয়া, সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলা, বিরক্ত বা অধৈর্য হয়ে পড়া, বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত শেষ করার জন্য সহজ কোনো বিকল্প বেছে নেওয়া।
একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মানসিকভাবে ক্লান্ত বোধ করাও এর একটি লক্ষণ হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে মনোযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কেন হয় সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি?
ব্যস্ত কর্মদিবস, অতিরিক্ত দায়িত্ব, অবিরাম নোটিফিকেশন ও তথ্যের চাপ, ঘুমের অভাব এবং মানসিক চাপ এ ধরনের ক্লান্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে অনেক বেশি বিকল্পের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া, পর্যাপ্ত বিরতি না নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিখুঁত করার চেষ্টা করাও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
কাজের পাশাপাশি বারবার মেসেজ, ই-মেইল ও অন্যান্য কাজের মধ্যে মনোযোগ পরিবর্তন করতে থাকলেও মানসিক চাপ বাড়তে পারে।
সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তির কারণ
সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- সারাদিন অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকা ও একের পর এক সিদ্ধান্ত নেওয়া
- অতিরিক্ত দায়িত্ব ও কাজের চাপ
- পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব
- দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ
- একসঙ্গে অনেক তথ্য, মেসেজ, ই-মেইল ও নোটিফিকেশনের চাপ
- একই বিষয়ে অনেক বেশি বিকল্পের মধ্যে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া
- গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে পর্যাপ্ত বিরতি না নেওয়া
- একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে গিয়ে বারবার মনোযোগ পরিবর্তন করা
- প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিখুঁত করার চেষ্টা করা
- ছোটখাটো বিষয় নিয়েও অতিরিক্ত চিন্তা করা
সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি কমাতে করণীয়
এ ধরনের মানসিক চাপ কমাতে কিছু অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে—
- দিনের সবচেয়ে সতেজ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া
- প্রতিদিনের ছোটখাটো কাজের জন্য নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করা
- দিনের করণীয় কাজের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা
- অপ্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও কাজ কমিয়ে আনা
- একসঙ্গে অনেক কাজ না করে একটি কাজে মনোযোগ দেওয়া
- কাজের মাঝে নিয়মিত ছোট বিরতি নেওয়া
- পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম নিশ্চিত করা
- গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় ফোন ও অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন দূরে রাখা
- সব সিদ্ধান্ত নিখুঁত হতে হবে—এমন চাপ নিজের ওপর না দেওয়া
- প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে ‘যথেষ্ট ভালো’ সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া
গবেষণায় কী বলা হয়েছে?
জার্নাল অব হেলথ সাইকোলজিতে প্রকাশিত ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধারাবাহিক চাপের ফলে তৈরি মানসিক ক্লান্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়, ক্রমাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ মানুষের মনোযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে।
সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তির সময়ে কেউ কেউ তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, আবার কেউ সিদ্ধান্ত নেওয়াই এড়িয়ে যেতে পারেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো যেসব পেশায় সারাদিন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের মানসিক চাপের বিষয়টি গবেষণায় আলোচিত হয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রতিদিনের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নানা সিদ্ধান্তের চাপ মানসিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কীভাবে মোকাবিলা করবেন?
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দিনের যে সময়টিতে নিজেকে সবচেয়ে বেশি সতেজ মনে হয়, সেই সময়টি বেছে নিতে পারেন। প্রতিদিনের ছোটখাটো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করলেও সিদ্ধান্তের চাপ কমানো সম্ভব।
এ ছাড়া প্রতিদিনের করণীয় কাজের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা রাখা, অপ্রয়োজনীয় কাজ সীমিত করা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা উপকারী হতে পারে। মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ করার সময় ফোন দূরে রাখাও সহায়ক হতে পারে।
সব সিদ্ধান্ত নিখুঁত হতে হবে—এমন প্রত্যাশা না রেখে কিছু ক্ষেত্রে ‘যথেষ্ট ভালো’ সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে মানসিক ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি বা সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে এবং তা কাজ, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। কারণ মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, ঘুমের সমস্যা এবং অন্যান্য কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।