কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বাড়বকুণ্ড এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে তারেক হোসেন বাপ্পীকে হত্যা এবং তাফসির আলম শাওনকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় প্রধান আসামি মোঃ আরিফ হোসেনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে পুলিশের দাবি, এমন একটি এলজি, একটি রিভলবার ও একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল রোববার বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোঃ মাসুদ আলম। এ সময় তিনি হত্যাকাণ্ডের পেছনের বিরোধ, হামলার ধরন এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
পুলিশ সুপার জানান, গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার রাত আনুমানিক পৌনে ১১টার দিকে সীতাকুণ্ড মডেল থানাধীন বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের অলিনগর তিন রাস্তার মোড়সংলগ্ন পাকা সড়কে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই রাতে খাবার খেয়ে বন্ধু ইমনকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে অলিনগর তিন রাস্তার মোড়ের দিকে যাচ্ছিলেন তারেক হোসেন বাপ্পী।
পথে আগে থেকেই আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওঁৎ পেতে থাকা অভিযুক্তরা তাঁদের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করেন। এরপর বাপ্পী ও তাঁর বন্ধুকে মোটরসাইকেল থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধর করা হয়।
একপর্যায়ে প্রধান অভিযুক্ত মোঃ আরিফ হোসেন বাপ্পীকে লক্ষ্য করে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেন। অন্য অভিযুক্তরাও তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। এ সময় বাপ্পীর সঙ্গে থাকা ইমন কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। পরে বাপ্পীর বুকে গুলি করা হয়। অপর এক অভিযুক্তও তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এতে বাপ্পী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
গুলির শব্দ শুনে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা তাফসির আলম শাওন বাপ্পীকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেন। এ সময় তিনিও হামলার শিকার হন। তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে বাপ্পী ও শাওন দুজনই গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় সড়কে পড়ে থাকেন। হামলাকারীরা তাঁদের ওপর আরও আঘাত করেন। পরে ঘটনাস্থলে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে হামলাকারীরা পালিয়ে যান।
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড
পুলিশ সুপার মোঃ মাসুদ আলম প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, তদন্তে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহত তারেক হোসেন বাপ্পীর সঙ্গে প্রধান অভিযুক্ত মোঃ আরিফ হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। বাপ্পী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অভিযুক্তদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য একাধিকবার সামাজিকভাবে ও মৌখিকভাবে সতর্ক করেছিলেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, পূর্ববিরোধের জেরে বাপ্পীকে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের পথে বাধা মনে করতেন অভিযুক্তরা। এ কারণে তাঁর ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় ঘটনার দিন আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অভিযুক্তরা আগে থেকেই ঘটনাস্থলে অবস্থান নেন। পরে বাপ্পীর মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। একপর্যায়ে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই সময়ে বাপ্পীকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসা শাওনও তাঁদের সশস্ত্র হামলার শিকার হন।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযান, উদ্ধার তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র
চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পরপরই অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামি মোঃ আরিফ হোসেনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একই অভিযানে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি এলজি, একটি রিভলবার ও একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা এবং উদ্ধার করা অস্ত্রের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে আরও যাচাই করা হবে।
গ্রেপ্তার ছয় আসামি
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন বাড়বকুণ্ড মধ্যম মাহমুদাবাদ দীঘির নামা গ্রামের ফকির আহম্মদের নতুন বাড়ির বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন প্রকাশ বিকষুর ছেলে মোঃ আরিফ হোসেন (২৯), একই গ্রামের অলিনগর চৌকিদার বাড়ির মৃত নুর আলমের ছেলে ফখরুল ইসলাম (৩২), বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের নডালিয়া গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে আব্দুল মান্নান (২৮), অলিনগর গ্রামের নতুন বদু বাড়ির বাসিন্দা মোজাম্মেল হকের ছেলে মোঃ ইফতেখার (৩৫), সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নের হাসনাবাদ জিয়াজি হুজরের বাড়ির মোঃ নজরুল ইসলামের ছেলে আরিফুল ইসলাম জাবেদ (২৫) এবং বাড়বকুণ্ড মধ্যম মাহমুদাবাদ দীঘির নামা এলাকার মৃত জহির ইসলামের ছেলে নুর আহাম্মদ।
প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোঃ জুনায়েত কাউছার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোঃ সিরাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) রাসেল পিপিএম (বার) এবং সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ মহিনুল ইসলামসহ পুলিশের অন্যান্য কর্মকর্তারা।
প্রকাশ্যে গুলি করে বাপ্পীকে হত্যা এবং শাওনকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর দ্রুত অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার ও তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি প্রেস ব্রিফিংয়ে তুলে ধরে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা, অস্ত্রের ব্যবহার এবং ঘটনার অন্যান্য দিক তদন্তের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হবে।