মোশারফ হোসেন জসিম পাঠান:
নেত্রকোনার ঐতিহাসিক মদনপুরে শুরু হয়েছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি (রহঃ)-এর পবিত্র ওরশ মোবারক। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথি উপলক্ষে চার দিনব্যাপী এ ধর্মীয় আয়োজনকে ঘিরে ইতোমধ্যে জমে উঠেছে পুরো মাজার প্রাঙ্গণ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্ত-আশেকান, পীরভক্ত, ফকির-মজনু-মাস্তানসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নেমেছে মদনপুরে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, একাদশ শতাব্দীতে (৪৪৫ হিজরি/আনুমানিক ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দ) ১২০ জন সঙ্গীসহ সুদূর পারস্য বা তুরস্কের রুমি অঞ্চল থেকে পূর্ব বাংলায় আগমন করেন হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি (রহঃ)। তিনি বর্তমান নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার মদনপুরে এসে আস্তানা গেড়ে ইসলাম ধর্মের শান্তির বাণী প্রচার শুরু করেন। স্থানীয় বৌদ্ধ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে তিনি ভালোবাসা, মানবিক আচরণ ও আধ্যাত্মিক প্রভাবের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়াননি; বরং নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন।
লোককথায় প্রচলিত আছে, তৎকালীন মদনপুরের রাজা—মদন মোহন কোচ, যিনি ‘মদনা রাজা’ নামেও পরিচিত—হযরতের অলৌকিক ক্ষমতায় প্রভাবিত হয়ে রাজত্ব ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তার অনুরোধেই এলাকার নামকরণ ‘মদনপুর’ হয় বলে অনেকে মনে করেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে তিনি ইসলামের একজন কামেল পীর হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
নেত্রকোনা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে মদনপুর গ্রামে অবস্থিত তার মাজার শরীফকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডল। মাজার প্রাঙ্গণে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাজারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। মগড়া নদীর তীরবর্তী মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এ মাজার শরীফের রক্ষণাবেক্ষণ করে জেলা প্রশাসনের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটি ও স্থানীয় খাদেমরা।
ওরশ উপলক্ষে প্রতিদিন লাখো মানুষের সমাগমে পুরো এলাকা এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত শিল্পীরা মুর্শিদি, ভাটিয়ালি, কাওয়ালি, হামদ-নাত, জিকির-আসকার পরিবেশন করছেন। গভীর রাত পর্যন্ত চলে আধ্যাত্মিক সংগীত ও ধর্মীয় আলোচনা। ভক্তদের জন্য প্রতিদিন দু’বার খাবারের আয়োজন করছে মাজার কর্তৃপক্ষ। দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসাফিররা এ সেবায় উপকৃত হচ্ছেন।
শুধু ওরশেই নয়, প্রতি বৃহস্পতিবার রাতেও মাজার শরীফে ভক্তদের উপস্থিতি থাকে চোখে পড়ার মতো। নিয়মিত মুর্শিদি গানের আসর ও জিকির মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়, যা এলাকাবাসীর আধ্যাত্মিক চর্চাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
সব মিলিয়ে, হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি (রহঃ)-এর পবিত্র ওরশ মোবারক শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি পরিণত হয়েছে আধ্যাত্মিক চেতনা, ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মহামিলনমেলায়।