খুলনা বিভাগে খাদ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতির জাল: আইনের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বহাল তবিয়তে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:

খুলনা বিভাগের খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড), জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি ফুড) এবং বিভিন্ন উপজেলার খাদ্য পরিদর্শকদের একটি অংশ আইনের তোয়াক্কা না করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এর ফলে সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দ খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম এবং সরকারি খাদ্য বণ্টন ব্যবস্থায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহল, ভুক্তভোগী জনগণ ও বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, খুলনা বিভাগের বিভিন্ন খাদ্য গুদাম, ডিলারশিপ ও খাদ্য বিতরণ কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অনিয়ম চললেও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ বা মামলা থাকার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়িয়ে তুলছে।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ এবং খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ তানভীর হোসেন। বিভিন্ন সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, তাদের দপ্তরের অধীনস্থ কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, খাদ্যশস্য সংগ্রহে অনিয়ম এবং গুদাম ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর তদন্ত বা মামলার মুখোমুখি হওয়ার পরও অনেক কর্মকর্তা কোনো ধরনের প্রশাসনিক শাস্তি ছাড়াই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এতে করে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারি অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুলনা বিভাগের খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ দাবি, বদলির নামে কোটি কোটি টাকার লেনদেন, ধান-চাল সংগ্রহে কেজিপ্রতি ঘুষ আদায়, ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কর্মসূচিতে অনিয়ম, খাদ্য গুদামে দুর্নীতি এবং ডিলার নিয়োগে অনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে।

এ সকল অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হিসেবে উঠে এসেছে রূপসা উপজেলার খাদ্য পরিদর্শক আশরাফুজ্জামান সোহাগ, যিনি খুলনা বিভাগীয় খাদ্য পরিদর্শক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা রয়েছে। মামলা থাকা সত্ত্বেও তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে মহেশ্বরপাশা কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদামের কেমিস্ট শেখ মনিরুল হাসান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও দুদকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া মোঃ মোশাররফ হোসেন নামে এক গুদাম ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধেও খাদ্যশস্য বিতরণে অনিয়ম, গুদাম ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি এবং সরকারি খাদ্যশস্য আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে বেড়ালেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

এছাড়া বিভিন্ন সূত্রে আরও যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন অনিন্দ্য পাল, মমতাজ পারভীন, রাশেদ আল রিপন, সাবরিনা কবির, ডুমুরিয়া উপজেলার ইলিয়াস হোসেন, সাবরিনা ইয়াসমিন, তরুণ বালা এবং অমিত প্রমুখ। অভিযোগ রয়েছে, এদের অনেকেই খাদ্যশস্য বিতরণ, গুদাম ব্যবস্থাপনা, ডিলার নিয়োগ এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়মের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রমে ঘুষ বাণিজ্য এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে অনেক ক্ষেত্রে প্রতি কেজি খাদ্যশস্যে নির্দিষ্ট হারে ঘুষ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক সময় পুরনো বস্তা নতুন বলে দেখিয়ে সরবরাহ করা হয় কিংবা নিম্নমানের চাল সরকারি কর্মসূচিতে বিতরণ করা হয়। এসব অনিয়মের কারণে সরকারের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির প্রকৃত সুবিধাভোগীরা প্রাপ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

খাদ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে আরেকটি বড় অভিযোগ হলো তথাকথিত বদলি বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতিতে জড়িত অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের অন্যত্র বদলি করা হয় এবং এই বদলি প্রক্রিয়ার পেছনেও বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়। ফলে দুর্নীতির মূল সমস্যার কোনো সমাধান হয় না; বরং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অন্য জায়গায় গিয়ে একই ধরনের অনিয়ম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। খুলনার একাধিক খাদ্য কর্মকর্তার দাবি, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অনেক ক্ষেত্রে তাকে শাস্তি না দিয়ে বরং সুবিধাজনক বা লাভজনক জায়গায় বদলি করা হয়। এর ফলে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন এবং সৎ কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন।

মহেশ্বরপাশা কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদামসহ খুলনা বিভাগের বিভিন্ন খাদ্য গুদামে সরকারি চাল ও গম সংরক্ষণ এবং বিতরণে অনিয়মের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অনেক সময় সরকারি গুদাম থেকে নিম্নমানের চাল সরবরাহ করা হয় কিংবা চালের পরিমাণ কম দেওয়া হয়। আবার কখনো সরকারি চাল বাইরে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ ধরনের অনিয়মের কারণে সরকারের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির প্রকৃত সুবিধাভোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে ভিজিএফ, ওএমএস এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ক্ষেত্রে এসব অভিযোগ বেশি শোনা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত দরিদ্র মানুষ খাদ্য সহায়তার কার্ড বা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আর প্রভাবশালী ব্যক্তি বা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অন্যরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, খাদ্য অধিদপ্তরের এই দুর্নীতির প্রভাব শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ সরকারের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিগুলো মূলত নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, শ্রমজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নেওয়া হয়। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে অনেক সময় সেই সুবিধা প্রকৃত মানুষের কাছে পৌঁছায় না। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ে। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে এসব অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই তদন্ত দীর্ঘসূত্রিতায় পড়ে থাকে।

সচেতন মহলের মতে, জবাবদিহিতার অভাবই এই দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ। প্রশাসনিক প্রভাব ও রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে অনেক কর্মকর্তা আইনের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। খুলনা বিভাগের খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর বিষয় এবং এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।

এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ, ভুক্তভোগী মানুষ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সরকারের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্য মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে খুলনা বিভাগের খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় সচেতন মহল প্রধানমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, খাদ্য অধিদপ্তরের এই দুর্নীতির জাল ভেঙে দিতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় গরিব ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারের নেওয়া খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি ব্যাহত হবে এবং দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। তাদের দাবি, খাদ্য অধিদপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে উদাহরণমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *