প্রতিদিন ভোরে স্কুলব্যাগ নেয়, রাতে আর ফেরে না, বরুড়ায় নিখোঁজের মিছিলে হারিয়ে যাচ্ছে শত শত কিশোরী

মোঃ আনজার শাহ:

সকালে মা ডাল-ভাত রান্না করেন। মেয়ে ইউনিফর্ম পরে বই-ব্যাগ কাঁধে নেয়। দরজা পেরিয়ে বের হয়ে যায়। কিন্তু স্কুল ছুটির পরেও সে আর ঘরে ফেরে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, তারপর উদ্বিগ্ন বাবা-মা ছুটে যান থানায়।

এটি কোনো একটি পরিবারের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় এই দৃশ্য এখন প্রায় প্রতিদিনের। মাধ্যমিক স্তরের কিশোরী শিক্ষার্থীরা একের পর এক নিখোঁজ হচ্ছে। থানায় জমছে জিডির স্তূপ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে উদ্বেগজনক সত্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কোনো ছেলের প্ররোচনায় বা প্রলোভনে পড়ে স্বেচ্ছায় চলে গেছে। পেছনে ফেলে গেছে ভেঙে পড়া একটি পরিবার, একটি অসম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ।

সংখ্যায় যা দেখা যাচ্ছে, বাস্তবতা তার চেয়েও ভয়াবহ

বরুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি ইনচার্জ) কাজী নাজমুল হক এই প্রতিবেদক আনজার শাহকে জানান,

“প্রতি মাসে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০টি নিখোঁজ জিডি হয়। বছর শেষে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০০ থেকে ৩৫০-এ। তবে অনেক পরিবার সামাজিক অবস্থানের কথা ভেবে থানায় আসেন না। তারা নীরবে সহ্য করেন।”

অর্থাৎ থানার খাতায় যে সংখ্যা উঠছে, প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে বহুগুণ বড়। যেসব পরিবার লোকলজ্জার ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না, তাদের যন্ত্রণা রয়ে যাচ্ছে চার দেয়ালের ভেতরে হিসাবের বাইরে, সমাজের দৃষ্টির আড়ালে।

একটি ব্যাগ পড়ে থাকে ঘরের কোণে, স্বপ্নগুলো পড়ে থাকে পথে

শুধু পরিবার নয়, প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থাও। অল্প বয়সে পড়ালেখা ছেড়ে দেওয়া এই মেয়েগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। তারপর শুরু হয় আরেক অধ্যায়,

  • অপ্রস্তুত বয়সে সংসারের ভার
  • শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঝুঁকি
  • অকালে মাতৃত্বের কারণে স্বাস্থ্য জটিলতা
  • আর্থিক পরনির্ভরশীলতা ও সুযোগহীনতা
  • সন্তানের জীবনেও দারিদ্র্যের চক্র বহন

একটি মেয়ে যখন শিক্ষার আলো থেকে ছিটকে পড়ে, তখন শুধু সে একা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার আগামী প্রজন্মও। এভাবে দারিদ্র্য ও অশিক্ষার দুষ্টচক্র প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে এই মেয়েরা? কারণের শিকড় অনেক গভীরে

বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে একাধিক কারণ,

১. সোশ্যাল মিডিয়ার ভয়াল ফাঁদ,
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় ফেসবুক, ইমো, টেলিগ্রামে পরিচয় হওয়া অপরিচিত মুখ ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে ‘বিশ্বস্ত’। মিথ্যা প্রেম, বিয়ের প্রতিশ্রুতি আর রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে কিশোরীদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবে তারা বুঝতে পারছে না কোথায় বিপদ লুকিয়ে আছে।

২. পারিবারিক নজরদারির শূন্যতা,
জীবিকার তাগিদে ব্যস্ত বাবা-মা অনেক সময় সন্তানের মানসিক পরিবর্তন, নতুন বন্ধুত্ব বা আচরণের পার্থক্য বুঝতে পারছেন না। সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার অভ্যাসও অনেক পরিবারে নেই।

৩. নৈতিক শিক্ষার গভীর সংকট,
ধর্মীয় শিক্ষা এবং পাঠ্যক্রমে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভালো-মন্দের পার্থক্য, সম্পর্কের সীমারেখা এবং নিজেকে সুরক্ষিত রাখার শিক্ষা যথেষ্টভাবে দেওয়া হচ্ছে না।

৪. সামাজিক বন্ধনের ক্ষয়,
একসময় পাড়া-মহল্লার প্রতিবেশীরা পরস্পরের সন্তানের খোঁজ রাখতেন। সেই সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই অতীত। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের আধুনিকতায় ‘পাশের বাড়ির মেয়ে কোথায় গেল’ এই প্রশ্নটুকু আর কেউ করেন না।

৫. দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা
গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিশোরীরা হঠাৎ ডিজিটাল দুনিয়ার অসীম তথ্যপ্রবাহের মুখোমুখি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিকভাবে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি তাদের নেই।

কী করতে হবে এখনই  একটি জরুরি দিকনির্দেশনা

এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব, তবে তার জন্য চাই সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ।

পরিবারের করণীয়

  • সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলুন, বন্ধুর মতো সম্পর্ক গড়ুন
  • ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সচেতন তদারকি রাখুন
  • মেয়েকে আত্মবিশ্বাসী ও সচেতন করে তুলুন
  • অস্বাভাবিক আচরণ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে কথা বলুন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব

  • নিয়মিত উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও অনুপস্থিতিতে তাৎক্ষণিক অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ
  • বিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং সেবা ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিশ্চিত করা
  • ধর্মীয়, নৈতিক ও সচেতনতামূলক ক্লাস পরিচালনা

স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা,

  • ইউনিয়ন ও পৌর পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা ও উঠান বৈঠক
  • বাল্যবিবাহ রোধে কঠোর মনিটরিং ও জিরো টলারেন্স নীতি
  • পুলিশ, প্রশাসন ও সমাজকর্মীদের সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা
  • ঝরে পড়া রোধে বিশেষ উপবৃত্তি ও প্রণোদনা চালু রাখা

ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের ভূমিকা

  • মসজিদের খুতবা ও ওয়াজ মাহফিলে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার
  • সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন
  • পারিবারিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ তৈরিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ

একটি মোমবাতি জ্বালাতে পারলেই আঁধার কাটে

প্রতিটি নিখোঁজ কিশোরী কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। সে কারও আদরের মেয়ে, কারও স্বপ্নের ভবিষ্যৎ, একটি দেশের অমূল্য সম্পদ। বরুড়ার এই সংকট আজ স্থানীয় হলেও এর শিকড় সমাজের গভীরে। বছরে ৩৫০টি জিডি কেবল একটি সংখ্যা নয়  এটি ৩৫০টি পরিবারের নীরব চিৎকার, ৩৫০টি ভেঙে পড়া স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।

সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটু বেশি সচেতন হন, একটু বেশি দায়িত্বশীল হন, তাহলেই এই আঁধার কাটতে পারে। আমাদের মেয়েরা শিক্ষিত হোক, নিরাপদ থাকুক, স্বপ্ন দেখুক এবং সেই স্বপ্ন পূরণ করুক এটাই হোক আমাদের সবার দৃঢ় অঙ্গীকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *