মোঃআনজার শাহ
চুলায় আগুন নেই। রান্নাঘরে হাহাকার। শিশুর মুখে সময়মতো খাবার তুলে দেওয়া যাচ্ছে না। হোটেল-রেস্তোরাঁয় তালা ঝুলছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথে বসার উপক্রম। কুমিল্লা মহানগর ও সদর উপজেলার লাখো মানুষের প্রতিদিনের এই বুকফাটা যন্ত্রণার নাম গ্যাস সংকট। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে এই অসহ্য দুর্ভোগ বুকে চেপে টিকে আছেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু আর নয়, অবশেষে সেই লাখো মানুষের আর্তনাদ সরাসরি কর্তৃপক্ষের কানে তুলে দিতে ময়দানে নামলেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ইমাম উদ্দিন শেখের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় নেতৃবৃন্দ এই সংকটের ভয়াবহ চিত্র বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন এবং অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানান। জবাবে বাখরাবাদ গ্যাসের এমডি সমস্যা দ্রুত সমাধানে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
যন্ত্রণার নাম কুমিল্লার গ্যাস সংকট,
কুমিল্লা মহানগর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের চাপ এতটাই শূন্যের কোঠায় নেমে আসে যে চুলায় রান্না করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গভীর রাতে সামান্য চাপ পাওয়া গেলেও তা দৈনন্দিন চাহিদার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার চড়া দামে সিলিন্ডার গ্যাস কিনছেন। কেউ কেউ ফিরে যাচ্ছেন সেই পুরনো কাঠের চুলায়। এতে একদিকে সংসারের খরচ লাগামছাড়া বাড়ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিও মারাত্মক আকার নিচ্ছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। সব মিলিয়ে গোটা এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
ক্ষোভ নিয়ে কর্তৃপক্ষের দরজায় বিএনপি,
এলাকাবাসীর বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দাবি সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরতে মতবিনিময় সভায় নেতৃত্ব দেন কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারী আবু এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ভিপি ওয়াসিম।
তাঁরা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, কুমিল্লার মানুষ বছরের পর বছর ধরে এই ভয়াবহ সংকট নীরবে সহ্য করে আসছেন। বারবার অভিযোগ জানানো হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই শুধু কথার ফুলঝুরি ছাড়া কিছুই মেলেনি। এই দুরবস্থা আর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাঁরা কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন অতি দ্রুত কার্যকর সমাধান না হলে বৃহত্তর গণআন্দোলন ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে তাঁরা বাধ্য হবেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক ফয়সালুর রহমান পাভেল, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রিয়াজউদ্দিন রিয়াজসহ ১৬ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা এবং বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ।
এমডির টেবিলে পৌঁছাল জনতার আর্তনাদ,
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ইমাম উদ্দিন শেখ নেতৃবৃন্দের উত্থাপিত সমস্যাগুলো অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে শোনেন। তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করে বলেন, কুমিল্লায় গ্যাস সরবরাহের বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক এবং এর দ্রুত সমাধান একান্ত জরুরি। তিনি আশ্বাস দেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কারিগরি পর্যায়ে ইতোমধ্যে বিস্তারিত পর্যালোচনা শুরু হয়েছে এবং অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, এবার চাই দৃশ্যমান পরিবর্তন,
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে জানান, এর আগেও বহুবার এই একই আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তা কথায় কথায় শেষ হয়েছে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এবার তাঁরা আর কেবল মুখের কথায় সন্তুষ্ট নন। তাঁরা চান দৃশ্যমান, বাস্তব এবং স্থায়ী সমাধান।
কুমিল্লার লাখো মানুষের একটাই প্রত্যাশা এবারের প্রতিশ্রুতি যেন সত্যিকারের পরিবর্তন বয়ে আনে, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই দুর্ভোগের যেন চিরস্থায়ী অবসান ঘটে এবং কুমিল্লার প্রতিটি ঘরের চুলায় আবার যেন আগুন জ্বলে ওঠে।