মোঃ আনজার শাহ:
কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ ছয় জেলার কোটি কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু করা। প্রবাসী-অধ্যুষিত ও রেমিট্যান্সে দেশসেরা জেলা কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ, লাকসাম, নাঙ্গলকোট, সোনাইমুড়ী, বেগমগঞ্জ, শাহরাস্তি, চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণ, লালমাই, বরুড়া, হাজীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাটখিল উপজেলার লাখো প্রবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই দাবি অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
দেশি-বিদেশি শিল্প-কারখানা সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে বিমানবন্দর থাকলেও দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে এখানে ওঠানামা করেনি কোনো যাত্রীবাহী বিমান। তবে সচল রয়েছে বন্দরের কার্যক্রম। প্রতি মাসে এখান থেকে সরকার আয় করছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রানওয়ে কার্পেটিং, ফায়ার ব্রিগেড স্থাপন এবং টাওয়ারে এয়ারক্রাফটের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ভিএইচএফ সেট বসানো হলে এই বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচলে আর কোনো বাধা থাকবে না।
আটটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর চালুর মহাপরিকল্পনায় কুমিল্লা
দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের আটটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এই তালিকায় রয়েছে কুমিল্লা বিমানবন্দরের নামও। বাকি সাতটি হলো বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, শমশেরনগর (মৌলভীবাজার), খানজাহান আলী (বাগেরহাট) এবং পটুয়াখালী বিমানবন্দর।
দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী কুমিল্লা বিমানবন্দর
কুমিল্লা বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেউরা-ঢুলিপাড়ার পাশে এই বিমানবন্দর স্থাপিত হয়। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে সেনাবাহিনী এটি ব্যবহার করত। একই বছর বন্দরটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং এরপর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর এখানে বিমান ওঠানামা করে।
পরবর্তীতে যাত্রীসংকটে বন্দরটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৪ সালে ফের চালু করা হলেও পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এয়ারলাইনসগুলো বিমান ওঠানামা বন্ধ করে দেয়। এরপর গত ৩২ বছর ধরে এই বন্দরে বিমান ওঠানামা না করলেও কার্যক্রম সচল রয়েছে এবং বর্তমানে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে কর্মরত।
সিগন্যাল থেকেই আসছে কোটি টাকার রাজস্ব
বিমান ওঠানামা না করলেও এই বন্দরের ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের বিমান থেকে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে সরকার। প্রতিদিন এই বন্দরের সিগন্যাল ব্যবহার করে ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি বিমান আন্তর্জাতিক আকাশপথে চলাচল করে।
বর্তমান চিত্র: ৭৭ একর জমিতে ভুতুড়ে পরিবেশ
সরেজমিনে দেখা যায়, ৭৭ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বিমানবন্দরে বর্তমানে বিরাজ করছে অনেকটা পরিত্যক্ত পরিবেশ। অধিকাংশ এলাকায় জন্মেছে গরুর ঘাস, ভেতরে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট একাধিক পুকুর। টেক-অফ ও ল্যান্ডিংয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়ম ভেঙে গড়ে উঠেছে বহু আবাসিক ভবন, যা ভবিষ্যতে বিমান চলাচলে বাধা হতে পারে বলে মনে করছেন কর্তৃপক্ষ। রানওয়ের পিচ উঠে বেরিয়ে এসেছে পাথরের কণা, জন্মেছে আগাছাও। তবে সক্রিয় রয়েছে ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ভারতের অভ্যন্তরীণ রুটসহ আগরতলা, ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরগামী বিমানগুলো নিয়মিত সিগন্যাল গ্রহণ করছে।
বেশি অর্থের প্রয়োজন নেই, বলছেন সংশ্লিষ্টরা
বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি পুনরায় চালু করতে খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন নেই। বিপুল পরিমাণ জমি থাকায় জমি অধিগ্রহণের ঝামেলাও নেই। প্রয়োজন শুধু রানওয়ে কার্পেটিং, ফায়ার সার্ভিস ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের জনবল নিয়োগ।
ইপিজেড ও প্রবাসী-অর্থনীতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক
বিমানবন্দর-লাগোয়া কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) দেশি-বিদেশি ৪৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত পণ্য উৎপাদন করছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কুমিল্লা ইপিজেড থেকে রপ্তানি হয়েছে ৯০২ দশমিক ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। এর আগের বছরগুলোতেও ধারাবাহিকভাবে সাত থেকে আট শ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে এই অঞ্চল থেকে।
প্রবাসী-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে সুপরিচিত কুমিল্লা থেকে গত পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন সাড়ে চার লাখেরও বেশি মানুষ। জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের তথ্যমতে, শুধু ২০২৩ সালেই বিদেশ গেছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ৫২০ জন। এই বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর অধিকাংশকেই বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়, যাতে বাড়তি সময় ও অর্থ—দুটোই ব্যয় হয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা ও ব্যবসায়ীদের দাবি
স্থানীয়দের দাবি, কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু হলে চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লাসহ পুরো অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ, সময় ও অর্থের অপচয় অনেকটাই কমে আসবে। একই দাবি কুমিল্লা ইপিজেডের একাধিক ব্যবসায়ীরও। তাঁরা বলছেন, বিমানবন্দর চালু হলে ইপিজেডে আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগকারী আসবেন, ফলে বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগও।
কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ডা. আজম খান নোমান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কুমিল্লায় বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা এখন সময়ের দাবি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানান তিনি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কুমিল্লা বিমানবন্দরের সিএনএস প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, বিমানবন্দরটি সরকারের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের দৈনিক ২৫-৩০টি বিমান তাদের ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল ব্যবহার করে, যার মাধ্যমে প্রতিবছর সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আসে। বর্তমানে বিমানবন্দরে নেভিগেশনাল যন্ত্রের আপডেটের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দরটি নতুন করে চালু করতে হলে রানওয়ের কার্পেটিং, ফায়ার ব্রিগেড এবং টাওয়ারে ভিএইচএফ সেট স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন দরকার। তবে চ্যালেঞ্জ হলো, নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই বিমানবন্দরের চারপাশে গড়ে উঠেছে বহু ভবন। ভবিষ্যতে যাতে অপরিকল্পিতভাবে আর কোনো আবাসিক ভবন নির্মিত না হয়, সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বন্ধ বিমানবন্দরগুলো চালুর বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানান, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর একটি প্রস্তাব ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কুমিল্লাসহ আশপাশের ছয় জেলার লাখো মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, বাড়বে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।