মোহাম্মদ হোসেন সুমন:
রোহিঙ্গা সংকটের এক দশকে পদার্পণের প্রাক্কালে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে তহবিল বণ্টন ও স্থানীয় এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও ভাসানচরের ৩৩টি ক্যাম্পে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করলেও মানবিক সাড়াদান কার্যক্রমের সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ এখনো খুবই সীমিত।
সিসিএনএফ (CCNF) ও কোস্ট ফাউন্ডেশনের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘রোহিঙ্গা সাড়াদানের স্থানীয়করণ বিষয়ক গবেষণা ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা সাড়াদানের বড় অংশের নেতৃত্ব ও অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ করছে। বিপরীতে স্থানীয় এনজিওগুলো প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম অর্থ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন টিমে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিত্ব ৫৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক এনজিও, জাতীয় এনজিও ও স্থানীয় এনজিও—প্রতিটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১৫ শতাংশ করে। ফলে সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো মূলত আন্তর্জাতিক অংশীজনদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছে। রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে রয়েছে আটটি প্রধান সেক্টর। গবেষণা অনুযায়ী, আটটি সেক্টরের নেতৃত্বই জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর হাতে। শুধু শিক্ষা সেক্টরে একটি আন্তর্জাতিক এনজিও কো-লিড হিসেবে রয়েছে।
তবে কোনো স্থানীয় এনজিও সেক্টর লিড কিংবা কো-লিড হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছে না। গবেষকদের মতে, এতে মানবিক সাড়াদান কার্যক্রমে স্থানীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (JRP) অনুযায়ী, ১৫ দশমিক ৬ লাখ মানুষকে সহায়তার জন্য প্রয়োজন ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার। গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই তহবিলের ৮৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ রয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর কাছে। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর কাছে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং জাতীয় এনজিওগুলোর কাছে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ তহবিল রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য সরাসরি কোনো তহবিল বরাদ্দ নেই।
গবেষকদের দাবি, স্থানীয়করণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন অঙ্গীকার থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মোট ৬৩টি প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন শুরু হয়। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক এনজিওর ২৮টি প্রকল্পে অর্থায়ন হয়েছে ৩৩০ মিলিয়ন টাকা, যা মোট অর্থের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ। জাতীয় এনজিওর ৩২টি প্রকল্পে অর্থায়ন হয়েছে ১৭৬ মিলিয়ন টাকা, যা ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
অন্যদিকে স্থানীয় এনজিওগুলোর অংশ মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। মোট ৬৩টি প্রকল্পে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৫১৯ মিলিয়ন টাকা। স্থানীয় সংস্থাগুলোর জন্য ব্র্যাক পরিচালিত পুলড ফান্ডের তথ্যও গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। এতে তহবিল পাওয়া সংস্থার মাত্র ২২ শতাংশ, অর্থাৎ ছয়টি স্থানীয় এনজিও। বিপরীতে ৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ ২১টি জাতীয় এনজিও এই তহবিল পেয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য নির্ধারিত তহবিল ব্যবস্থায়ও স্থানীয় সংগঠনগুলো প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছে না। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (UNOCHA) যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বরাদ্দ করেছে। এর মধ্যে ৯২ শতাংশ পেয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো এবং ৮ শতাংশ পেয়েছে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো। স্থানীয় সংগঠনকে সরাসরি অর্থায়নের অঙ্গীকার থাকলেও কক্সবাজারে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—যদি জেআরপিতে স্থানীয় এনজিওগুলো আবেদনকারী সংস্থা হিসেবেই পর্যাপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকে, তাহলে তারা ভবিষ্যতে কীভাবে সরাসরি আন্তর্জাতিক তহবিল পাবে?
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এতে কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও চাপ বেড়েছে। দীর্ঘদিনেও টেকসই প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ক্যাম্পগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—আর কতদিন তাদের এই সংকটের বোঝা বহন করতে হবে এবং তাদের আর কত ত্যাগ স্বীকার করতে হবে?
রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে স্থানীয়করণ জোরদারে গবেষণায় ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মানবিক সাড়াদানের প্রতিটি স্তরে স্থানীয় এনজিওর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, সব সেক্টরে স্থানীয় এনজিওর কো-লিডারশিপ চালু, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সংগঠনের জন্য সরাসরি তহবিল বাড়ানো এবং পুলড ফান্ডে স্থানীয় এনজিওর জন্য অন্তত ২৫ শতাংশ সরাসরি অর্থায়ন নিশ্চিত করা। এ ছাড়া স্থানীয় সংগঠনগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অংশীজনের মধ্যে সমতাভিত্তিক অংশীদারত্ব, বাংলাদেশভিত্তিক স্থানীয়করণ কৌশল প্রণয়ন এবং স্থানীয় এনজিও নেটওয়ার্কের ভূমিকা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। গবেষণায় সর্বোপরি রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে একটি যৌথ প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
এতে প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ রাখার পাশাপাশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পুরো প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিসিএনএফ ও কোস্ট ফাউন্ডেশনের গবেষণার মূল বক্তব্য হলো—রোহিঙ্গা সাড়াদানের তহবিল শুধু বাড়ালেই হবে না; তহবিল কোথায় যাচ্ছে, কারা তা পরিচালনা করছে এবং স্থানীয় সংগঠনগুলো কতটা অংশীদার হচ্ছে—এসব ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থানীয় নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।