শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকেই নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

শিশু সবসময় কোনো ঘটনার সরাসরি শিকার হয়ে ভুক্তভোগী হয় না। অনেক সময় সে শুধু একটি ঘটনা দেখে। কিন্তু সেই দেখাও তার মনে এমন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না। সময়ের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব প্রকাশ পেতে পারে।

কোথাও একটি শিশু নির্যাতনের শিকার হলো। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেল। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কেউ ভিডিওটি দেখল, আবার অন্য কেউ সেটি আরেকজনকে পাঠাল। কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করল, কেউ আলোচনা করল, কেউবা কৌতূহলবশত ভিডিওটি দেখতে থাকল। এভাবেই একটি ঘটনা তার ঘটনাস্থল ছাড়িয়ে পৌঁছে গেল হাজার হাজার মানুষের ঘরে। সেই ঘরগুলোর কোনো কোনো ঘরে এক বা একাধিক শিশুও ছিল।

শিশুটি হয়তো ঘটনাটি পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। কিন্তু সে দৃশ্যটি দেখেছে। সে দেখেছে তার বয়সী আরেকটি শিশু কষ্টে আছে। দেখেছে বড়রা ঘটনাটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। হয়তো রাতে মাকে প্রশ্ন করেছে, ‘আমার সঙ্গেও কি এমন হতে পারে?’

অর্থাৎ একটি শিশু আক্রান্ত হলো, কিন্তু আরেকটি শিশু আতঙ্কিত হয়ে উঠল। আজকের বাস্তবতায় শিশুদের ভুক্তভোগী হওয়ার ধারণাটিকে তাই নতুন করে ভাবতে হবে। ভুক্তভোগী শুধু সেই শিশু নয়, যার ওপর সরাসরি নির্যাতন হয়েছে। ভুক্তভোগী সেই শিশুটিও, যে প্রতিদিন অন্য শিশুদের ওপর ঘটে যাওয়া সহিংসতা দেখে বড় হচ্ছে।

যে শিশু টেলিভিশনের পর্দায় দুর্ঘটনা দেখে, বাবার মোবাইলে মারামারির ভিডিও দেখে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বয়সী কোনো শিশুকে অপমানিত হতে দেখে কিংবা স্কুলে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার খবর শোনে—তার মনেও একটি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে, ‘আজ আমি নিরাপদ তো?’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। টমাস হবসের চিন্তায়ও মানুষ এমন একটি অনিরাপদ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, যেখানে নিজের নিরাপত্তা সে নিজে নিশ্চিত করতে পারে না। তাই এমন একটি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রয়োজন হয়, যা নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

অবশ্য আধুনিক রাষ্ট্র টমাস হবসের সময়ের রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। এখন রাষ্ট্র শুধু বাহ্যিক শত্রুর হাত থেকে নাগরিককে রক্ষা করে না; নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক বিকাশও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ।

শিশুর ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ শিশুরা রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের অন্যতম। তাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, অথচ তারা সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে না। তারা সবসময় বিপদ সম্পর্কে সচেতন নয়। কোন তথ্য সত্য, কোনটি মিথ্যা কিংবা কোন ভিডিও তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে—তা বোঝার সক্ষমতাও তাদের সীমিত। অনলাইনে কোনো সমস্যায় পড়লে কোথায় সাহায্য চাইতে হবে, সেটিও অনেক শিশু জানে না।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক চাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু একটি শিশু যখন কোনো ভিডিও দেখা শুরু করে এবং তার সামনে একই ধরনের একের পর এক কনটেন্ট আসতে থাকে, তখন বিষয়টি আর শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এখানেই আসে অ্যালগরিদমের প্রশ্ন। আগে আমরা ভাবতাম, শিশু কী দেখবে তা নির্ভর করে তার পরিবার, স্কুল কিংবা টেলিভিশনের ওপর। এখন তার সামনে কী আসবে, তার একটি বড় অংশ নির্ধারণ করছে এমন কিছু অদৃশ্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, যেগুলো শিশুটি নিজেও বোঝে না।

একটি শিশু হয়তো কৌতূহলবশত দুর্ঘটনার ভিডিও দেখল। এরপর তার সামনে আরও দুর্ঘটনার ভিডিও আসতে পারে। সে সহিংস ঘটনার একটি ভিডিও দেখল, এরপর একই ধরনের আরও কনটেন্ট তার সামনে হাজির হতে পারে। ভয়াবহ কোনো ঘটনার প্রতি কয়েক সেকেন্ড বেশি মনোযোগ দেওয়ার অর্থ হতে পারে, প্রযুক্তিগত সুপারিশব্যবস্থা ধরে নিয়েছে যে এই ধরনের কনটেন্টে তার আগ্রহ রয়েছে।

অতি সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের একটি আদালতে মেটার বিরুদ্ধে বড় ধরনের আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে যৌথভাবে মামলা করেছে। অভিযোগ, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে জেনেও লাভজনক ব্যবসার স্বার্থে মেটা তাদের প্ল্যাটফর্মে কিশোর-কিশোরীদের দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখার মতো ব্যবস্থা করেছে।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—যে ডিজিটাল পরিবেশ প্রতিদিন কোটি কোটি শিশুর চিন্তা, আচরণ, তথ্য গ্রহণ এবং সামাজিক বিকাশকে প্রভাবিত করছে, সেই পরিবেশে রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব থাকবে না কেন?

আগে ধারণা ছিল, রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে এবং নাগরিক তা অনুসরণ করবে। কিন্তু আধুনিক শাসনব্যবস্থায় একটি জটিল সামাজিক সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজেরও ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তাও তেমনই একটি বিষয়।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া নয়। শিশুর হাতে মোবাইল নিষিদ্ধ করে দেওয়াও বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। প্রযুক্তি এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষা, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও জ্ঞান অর্জনের অসংখ্য সুযোগও প্রযুক্তি তৈরি করেছে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করা নয়; বরং প্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্যেই নাগরিকের, বিশেষ করে শিশুর, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখানেই কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে শাস্তি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে না; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করে, যেখানে নাগরিকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।

বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, বড় কোনো ঘটনা ঘটার পর আমরা নড়েচড়ে বসি। আলোচনা হয়, প্রতিবাদ হয়, তদন্ত হয়, নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনা আগের ঘটনাকে আড়াল করে ফেলে। কিন্তু শিশুর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই ‘ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া’ সংস্কৃতি যথেষ্ট নয়।

রাষ্ট্রকে এমন একটি কার্যকর শিশু সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো ঘটনা ঘটার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করার উদ্যোগ থাকবে। শিশুর জন্য যেমন নিরাপদ স্কুল দরকার, তেমনি দরকার নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ। নিরাপদ রাস্তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নিরাপদ অনলাইন যোগাযোগ। বাস্তব জীবনে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা যেমন থাকতে হবে, তেমনি অনলাইনে বিপদে পড়লে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুর নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজেরও দায়িত্ব। একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা মানে কেবল তাকে একটি বিপদ থেকে রক্ষা করা নয়; বরং তার সুস্থ মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার পথটিও নিরাপদ করা। তাই শিশু সুরক্ষায় প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং আগাম প্রস্তুতিমূলক ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *