Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home/u102988081/domains/dailyswadhinsangbad.com/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260
কোম্পানি রপ্তানি দেখাল ১২১ টন, কনটেইনার ও ডিপোতে মিলল না পণ্য - দৈনিক স্বাধীন সংবাদ

কোম্পানি রপ্তানি দেখাল ১২১ টন, কনটেইনার ও ডিপোতে মিলল না পণ্য

স্টাফ রিপোর্টার:

কাগজপত্রে প্রায় ১২১ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানির ঘোষণা দেওয়া হলেও সরেজমিনে সেই পণ্যের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি রপ্তানির জন্য নির্ধারিত ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতেও ঘোষিত পণ্য প্রবেশের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কাগজে এসব পণ্যের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৪ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

ঘটনাটি ঘটেছে ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের পাঁচটি রপ্তানি চালানকে ঘিরে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তৎপরতায় সন্দেহজনক এসব চালান আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে পণ্য রপ্তানির ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়ার কথা জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিষয়টি নিয়ে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেড, সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করেই কীভাবে রপ্তানি-সংক্রান্ত কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো, সেটিও তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

এনবিআর গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে। এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে রপ্তানি চালান যাচাইয়ের সময় ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের পাঁচটি রপ্তানি চালান কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নজরে আসে। প্রাথমিকভাবে এসব চালানের তথ্য বিশ্লেষণ করে পণ্যের ধরন, গন্তব্য দেশ এবং ঘোষিত মোট ওজনের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়। এসব অসঙ্গতির কারণে চালানগুলোকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে অধিকতর যাচাই-বাছাই শুরু করেন কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা। নথিপত্র পর্যালোচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রপ্তানি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপের তথ্য যাচাই করা হয়। একপর্যায়ে সরেজমিনে পণ্য থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে গিয়ে তদন্ত শুরু করেন কর্মকর্তারা।

দাখিল করা কাগজপত্র ও অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি চালানে মোট ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ কেজি বা প্রায় ১২১ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানির ঘোষণা দেওয়া হয়। এই বিপুল পরিমাণ পণ্যের ঘোষিত মূল্য ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৪ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। তবে কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সরেজমিনে যাচাই করতে গিয়ে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল পাননি বলে এনবিআর জানিয়েছে।

তদন্তে পাঁচটি চালানের গন্তব্য নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাধারণত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। কিন্তু ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের আলোচ্য পাঁচটি চালানের গন্তব্য হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিপাইনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। গন্তব্য, পণ্যের ধরন এবং ঘোষিত ওজনের বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কাস্টমস গোয়েন্দারা চালানগুলোকে অধিকতর যাচাইয়ের আওতায় নেন।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের গত এক বছরে আমদানি করা কাঁচামালের পরিমাণের সঙ্গে ঘোষিত রপ্তানি পণ্যের পরিমাণের মধ্যেও অস্বাভাবিকতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা। তদন্তসংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আমদানি করা কাঁচামালের তুলনায় ঘোষিত রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ বেশি। এ পরিমাণ স্বাভাবিক ইনপুট-আউটপুট কো-এফিসিয়েন্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই নেওয়া হবে।

দাখিল করা বিল অব এক্সপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি রপ্তানি চালান ইসাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের একটি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর মাধ্যমে রপ্তানি হওয়ার কথা ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ডিপোতে সরেজমিনে যান। সেখানে ঘোষিত পণ্য পরীক্ষণের জন্য উপস্থাপন করতে ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাদের সামনে কোনো পণ্যই উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। বরং ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রপ্তানির জন্য ঘোষিত পণ্যগুলো বাস্তবে ওই ডিপোতে প্রবেশই করেনি। এ অবস্থায় কাগজপত্রে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানির ঘোষণা এবং বাস্তবে পণ্যের অনুপস্থিতির বিষয়টি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—রপ্তানি পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করলেও কীভাবে ওই পাঁচটি চালানের কাস্টমস-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো? স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রপ্তানির জন্য নির্ধারিত পণ্য সংশ্লিষ্ট ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে প্রবেশ করার পর প্রয়োজনীয় যাচাই ও কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এরপর পণ্য রপ্তানির পরবর্তী ধাপে যায়। কিন্তু ভ্যালমন্ট ফ্যাশনসের পাঁচটি চালানের ক্ষেত্রে ডিপো কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী ঘোষিত পণ্য সেখানে প্রবেশই করেনি। ফলে পণ্য ছাড়া কীভাবে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া এগিয়েছে, সেটিই এখন তদন্তকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পণ্যের বাস্তব অস্তিত্ব ছাড়াই পাঁচটি চালানের বিপরীতে রপ্তানি প্রদর্শনের অপচেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের নজরদারি এবং বিশেষ তৎপরতার কারণে বিষয়টি প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। তবে পণ্যবিহীন রপ্তানি দেখানোর পেছনে কারও পরিকল্পিত ভূমিকা ছিল কি না, কিংবা কাগজপত্র তৈরির পর্যায়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা যোগসাজশ হয়েছে কি না—তা এখনো তদন্তাধীন।

ঘটনার সঙ্গে ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর কারও যোগসাজশ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। একই সঙ্গে কাস্টমস প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। কারণ, পণ্য বাস্তবে ডিপোতে প্রবেশ না করলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে কীভাবে পণ্যের পরিমাণ, মূল্য ও রপ্তানি-সংক্রান্ত তথ্য উঠে এলো—এ প্রশ্নের উত্তর বের করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস ও আইসিডির তত্ত্বাবধানে থাকা বিভিন্ন ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় রপ্তানি পণ্যের প্রবেশ, নথিপত্র যাচাই, কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা এবং পরবর্তী রপ্তানি কার্যক্রমের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। ভ্যালমন্ট ফ্যাশনসের পাঁচটি চালানের ক্ষেত্রে এসব ধাপের কোনো পর্যায়ে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য কাস্টমস আইন এবং অন্যান্য আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ঘটনায় কারও দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। তবে প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য কাগজে রপ্তানি দেখানো হলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব না পাওয়ার ঘটনায় রপ্তানি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *